পিনাকী ধোলে, হাসন: তিনি বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি, জেলা তৃণমূলের শীর্ষস্তরের নেতা। সেই কাজল শেখ এবার জীবনে প্রথম বিধানসভা নির্বাচনের আঙিনায়। আর প্রথম লড়াইতেই তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর লক্ষ্য কেবল বিধানসভার চৌকাঠ পেরোনো নয়, বরং জয়ের ব্যবধানে জেলার সর্বকালীন রেকর্ড চুরমার করা। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিপূর্বেই স্পষ্ট করেছেন, ‘এই নির্বাচন স্রেফ জেতার জন্য নয়, বরং বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্তু করার লড়াই।’ সেনাপতির সেই নির্দেশকে শিরোধার্য করে হাসন বিধানসভার প্রতিটি বুথে এখন ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালাচ্ছেন কাজল। লক্ষ্য একটাই, বিরোধীদের ভোট ব্যাঙ্কে সিঁধ কেটে জয়ের মার্জিনকে আকাশছোঁয়া করা।
নলহাটি ২ ব্লকের ৬টি এবং রামপুরহাট ২ ব্লকের ৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে হাসন বিধানসভা। হাসন দীর্ঘকাল ছিল কংগ্রেসের দুর্গ। ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই আসনটি ছিল বোলপুরের বর্তমান সাংসদ অসিত মালের খাসতালুক। টানা পাঁচবার তিনি এখান থেকে কংগ্রেসের টিকিটে বিধানসভায় গিয়েছেন। ২০১৬ সালে তিনি দলবদল করে ঘাসফুলের ঝান্ডা ধরলেও নিজের গড়ে হেরেছিলেন একদা সতীর্থ তথা কংগ্রেসের তৎকালীন জেলা সভাপতি মিল্টন রশিদের কাছে। এরপর থেকে হাসন বিধানসভায় শক্তিবৃদ্ধি করতে শুরু করে তৃণমূল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন বীরভুমের অধিকাংশ আসনে বিজেপি থাবা বসিয়েছিল, তখন এই হাসনই ছিল তৃণমূলের ত্রাতা। ২০২১ সালের বিধানসভাতেও বিদায়ী বিধায়ক অশোক চট্টোপাধ্যায় এখান থেকে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের লিড পেয়েছিলেন। এবার সেই গ্রাফকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে মরিয়া কাজল শেখ।
একুশের বিধানসভায় হাসনে কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন মিল্টন। তিনি পেয়েছিলেন প্রায় ৪০ হাজার ভোট। দ্বিতীয়স্থানে উঠে এসেছিল বিজেপি। বিজেপির প্রার্থী নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট পেয়েছিলেন প্রায় ৫৭ হাজার। এবারের নির্বাচনেও কংগ্রেসের প্রার্থী মিল্টন। বিজেপির বাজি সেই নিখিলই। তবে, এবারের লড়াই চতুর্মুখী। গতবারে বাম-কংগ্রেস জোট হলেও এবারে তা হয়নি। বামেরা প্রার্থী করেছে কামাল হাসানকে। কাজল শেখের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস এই কেন্দ্রের ৫০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু ভোটার। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজলের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই এখন শাসকদলের প্রধান ভরসা। কাজল এবার কৌশলী চাল চেলেছেন সেই সব বুথে, যেখানে গতবার তৃণমূল পিছিয়ে ছিল। বুথ স্তরের বিজেপি ও কংগ্রেস কর্মীদের নিজের শিবিরে টেনে এনে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন, ‘এখানে জোড়াফুল ফুটবেই, অন্য ফুল ফোটার আশা নেই। তাই অন্য দলকে ভোট দিয়ে নিজেদের মূল্যবান ভোট নষ্ট করবেন না।’ এনিয়ে বিজেপি প্রার্থী নিখিলবাবু পাল্টা বলেন, ‘বুথ স্তরে ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দিয়ে উনি আমাদের দল ভাঙাতে চাইছেন। কিন্তু হাসনের মানুষ জানেন, কাজল শেখ বহিরাগত। এর জবাব এখানকার মানুষই দেবেন।’ মিল্টন রশিদ বলেন, ‘হাসন কংগ্রেসের আবেগের মাটি। ভয় দেখিয়ে বা ভোট কেটে জেতার দিন শেষ। মানুষ এবার ঠিক সময়ে ঠিক জবাবটাই দেবেন।’
রাজনৈতিক মহলের মতে, কাজল শেখের কাছে এই নির্বাচন স্রেফ একটি আসন জয়ের লড়াই নয়, বরং বীরভূমের রাজনীতিতে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করার এক অগ্নিপরীক্ষা। বিরোধীদের ঘরে সিঁধ কেটে কাজল যেভাবে লিড বাড়ানোর নেশায় বুথ সামলাচ্ছেন, তাতে হাসনের নির্বাচনি ময়দান এখন রীতিমতো তপ্ত। এখন দেখার, এই প্রেস্টিজ ফাইটে কাজল জেলার সর্বোচ্চ লিডের রেকর্ড গড়তে পারেন কি না।