বিদ্যাসাগর হাসপাতালের মানোন্নয়ন করাই লক্ষ্য তৃণমূলের, দুর্নীতিকে বিঁধছে বিজেপি-সিপিএম
বর্তমান | ০৮ এপ্রিল ২০২৬
স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: বেহালা বাজার— মেট্রো স্টেশনের নীচে গিজগিজ করছে পথচারী। সেই সঙ্গে যানবাহনের চাপ। স্টেশনের ঠিক নীচেই সরু গলি। এই গলি দিয়ে কিছুটা এগলেও বোঝার উপায় নেই, দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি এই এলাকায় অবস্থিত। বিদ্যাসাগর স্টেট জেনারেল হাসপাতাল। আলিপুর, সাহাপুর, নিউ আলিপুর, পাঠকপাড়া, বেহালা, পর্ণশ্রী, সরশুনা, সখেরবাজার, শীলপাড়া, ঠাকুরপুকুর সহ শহরতলির বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি চিকিৎসার একমাত্র জায়গা এটি। যদিও এই ভরসার জায়গা বর্তমানে ‘মৃতপ্রায়’। খুব ঠেকায় না পড়লে মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন না। বেহাল পরিকাঠামো, নিম্নমানের পরিষেবার অভিযোগ ওঠায় মানুষ আস্থা হারাচ্ছেন এই হাসপাতালের উপর থেকে। তাঁদের আস্থা ফেরাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বেহালা-পশ্চিম কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়। আবার একেই নিশানা করেছেন বিরোধী দলের প্রার্থীরা। তাই বিদ্যাসাগর হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এবার বিধানসভা ভোটে বেহালা পশ্চিমে জয়ের বীজ বুনছে শাসক থেকে বিরোধীরা।
হাসপাতালে ঢুকতেই দেখা গেল, এক ব্যক্তি মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় বেরিয়ে আসছেন। ব্যান্ডেজে রক্তের দাগ স্পষ্ট। তাঁর সঙ্গে দুজন আত্মীয়। জখমের নাম রবিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। তিনি বললেন, সরশুনার কাছে পথ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। রাজমিস্ত্রির কাজ করেন তিনি। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে দেখানোর পয়সা নেই। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘এখানে অ্যাক্সিডেন্ট কেস ছাড়া ইমার্জেন্সিতে বিশেষ কাউকে আসতে দেখবেন না। মেশিনপত্রও ভালো না। তবে হালকা চোট আঘাতের জন্য ঠিক আছে।’
‘এমআর বাঙ্গুর, ন্যাশনাল মেডিকেলে যখন ভিড়ে ঠাসা অবস্থা, তখন বেহালার বিদ্যাসাগর হাসপাতালের এমন করুণ দশা কেন? এদিকে নজর পড়ে না কেন শাসকদলের? প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা। সিপিএমের টিকিটে এবার বেহালা-পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়ছেন নীহার ভক্ত। এলাকায় পরিচিত মুখ। এক সময় এই এলাকার কাউন্সিলার ছিলেন। তাঁর দাবি, ‘এলাকার বিধায়ক তো চাকরি চুরিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই হয়তো এদিকে নজর পড়েনি।’ প্রাক্তন বিধায়কের প্রসঙ্গ এড়ালেও বিদ্যাসাগর হাসপাতালের মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তৃণমূল। জোড়াফুলের টিকিটে এবার লড়ছেন রত্না চট্টোপাধ্যায়। তিনি পাশের কেন্দ্র বেহালা-পূর্বের বিধায়ক ছিলেন। তিনি আবার ১৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলারও বটে। তাঁর বক্তব্য, ‘বিদ্যাসাগর হাসপাতাল নিয়ে মানুষের অভিযোগ আমার কাছেও আসে। দল যখন আমাকে এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে, তখন আমার টু-ডু লিস্টে এক নম্বরে রেখেছি বিদ্যাসাগর হাসপাতালের পরিষেবাকে।’
নিউ আলিপুর থেকে বুড়োশিবতলা হয়ে বেহালা আসার পথে ডানদিকে তাকালেই নজরে আসতো বিধায়ক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পোস্টার, ব্যানার। ডায়মন্ডহারবার রোডের উপর ম্যান্টনে বিধায়কের অফিস বলে বাস-অটোর ‘অলিখিত’ স্টপেজও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, সেসব এখন অতীত। সেই পার্থও রাজনীতিতে নেই, অফিসও নেই। ২০২১ সালে তৃণমূলের টিকিট ৫০ হাজারে বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজেপি প্রার্থী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন পার্থ। কিন্তু, গত চার বছরে ইডি, সিবিআইয়ের টানাটানির জেরে বিধায়কের দেখা পাননি বেহালা-পশ্চিমের বাসিন্দারা। এবার রত্না চট্টোপাধ্যায় এই কেন্দ্রে জয়ের ব্যাপারে প্রত্যয়ী। তাঁর কথায়, গত পাঁচ বছরে বেহালা-পশ্চিমে রাস্তাঘাটের অবস্থা আমূল বদলেছে। কিন্তু, এখনও বেশ কিছু জায়গায় জল জমার সমস্যা রয়েছে। বিধায়ক নির্বাচিত হলে আমার দ্বিতীয় কাজ হবে ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশন।
অন্যদিকে, দুর্নীতিকেই হাতিয়ার করেছে বিজেপি। একুশে কসবা কেন্দ্রে জাভেদ খানের কাছে ৬৩ হাজারেরও বেশি ভোটে গোহারা হেরে গিয়েছিলেন বিজেপির যুব মোর্চার নেতা ডাঃ ইন্দ্রনীল খাঁ। এবার বেহালা পশ্চিমে তাঁকে লড়তে পাঠিয়েছে পদ্মপার্টি। কী হবে ভবিষ্যৎ? প্রার্থীর কথায়, ‘বেহালার মানুষ তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেখেছে, কী হয়। বিধায়ক চাকরি বিক্রি করেন, আর তাঁর বান্ধবীর খাটের নীচে থেকে সেই চাকরি বিক্রির টাকা উদ্ধার হয়। ওই ভুল মানুষ আর করবে না।’