এই সময়, নয়াদিল্লি: বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই বাড়ছে নির্বাচন কমিশন এবং বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের টানাপড়েন৷ বুধবার দিল্লিতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন ফুলবেঞ্চের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনের নেতৃত্বাধীন চারজনের প্রতিনিধিদল।
মিনিট সাতেকের বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে ডেরেকরা তীব্র ভাবে নিশানা করেন জ্ঞানেশকে। ডেরেকের দাবি, ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার আমাদের নির্বাচন কমিশনের অফিস থেকে বের করে দিয়েছেন। কোনও প্রশ্নের উত্তর দেননি। আমাদের বলেছেন, গেট লস্ট।’ কমিশনের কোনও কর্তা এ নিয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য না–করলেও কমিশন সূত্রের দাবি, ফুলবেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক চলাকালীন তৃণমূলের প্রতিনিধিদল সুর চড়িয়ে কথা বলছিলেন। তখন তাঁদের আস্তে কথা বলতে বলেন সিইসি জ্ঞানেশ। তারপরেই জোড়াফুলের প্রতিনিধিদল বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
বিতর্ক অবশ্য এখানে শেষ হয়নি। বরং তা আরও জোরালো হয় নির্বাচন কমিশনের একটি পোস্টকে ঘিরে। এক্স হ্যান্ডলে বেনজির ভাবে সরাসরি তৃণমূলের নাম করে ওই পোস্টে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়— ‘তৃণমূল কংগ্রেসকে নির্বাচন কমিশন শেষবারের মতো সতর্ক করে দিচ্ছে: এ বার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন নিশ্চিত ভাবেই হবে— ভয়মুক্ত, হিংসামুক্ত, ভীতিপ্রদর্শন-মুক্ত, প্রলোভন-মুক্ত, হামলা-মুক্ত এবং বুথ ও সোর্স জ্যামিং-মুক্ত।’ এই পোস্টটি বিতর্কের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। কোনও রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ করে এই ধরনের পোস্ট আদৌ কমিশন করতে পারে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল নেতৃত্বের পাশাপাশি অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ।
সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের পরে যে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের কী হবে, তা জানতে এ দিন ডেরেক, সাগরিকা ঘোষ, মেনকা গুরুস্বামী ও সাকেত গোখলে গিয়েছিলেন দিল্লিতে নির্বাচন সদনে। সূত্রের দাবি, ১০টা ৫ মিনিটে কমিশনে স্মারকলিপি জমা করে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল৷ এর পরে সোজা সিইসি–র ঘরে যান তাঁরা৷ সূত্রের খবর, তৃণমূল প্রতিনিধিরা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞানেশ প্রশ্ন করেন, ‘আপনাদের অথরাইজ়ড সিগনেটরি (চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য) এবং দলের জেনারেল সেক্রেটারি (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) কোথায়?’
উত্তরে ডেরেক বলেন, ‘দু’জনেই নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত আছেন৷ দলের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা চারজন এসেছি৷ আপনাদের আপত্তি থাকলে আমরা চলে যাচ্ছি৷ তার আগে আমরা বলতে চাই, রাজ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক৷’ তাঁকে বাধা দিয়ে জ্ঞানেশ বলেন, ‘কমিশনের তরফে আমরা সব সময়েই ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন সুনিশ্চিত করে থাকি৷’ ডেরেকের জবাব, ‘আমরা আপনার কথা অনেক শুনেছি৷ আপনার সতীর্থ দুই নির্বাচন কমিশনার কোনও দিন কিছু বলেন না৷ তাঁদের কথাও একটু শুনি আজ৷’
জ্ঞানেশ তখন তাঁকে থামাতে গেলে ডেরেক উত্তেজিত ভাবে বলেন, ‘আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি, আপনিই দেশের প্রথম সিইসি যাঁর বিরুদ্ধে সংসদের দু’টি কক্ষেই মোশন ফর রিমুভাল নোটিস পেশ করা হয়েছে৷’ ডেরেককে আর কিছু বলতে না দিয়ে জ্ঞানেশ বলেন, ‘ডোন্ট স্পিক লাউডলি৷ আপনি নির্বাচন কমিশন অফিসে এসে অশোভন আচরণ করতে পারেন না৷’ পাল্টা ডেরেক বলেন, ‘আমাকে শেখাবেন না, কী ভাবে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে৷’ অভিযোগ, তখনই জ্ঞানেশ তাঁদের বলেন, ‘গেট লস্ট’। যা শোনা মাত্রই ডেরেক বলেন, ‘আপনি আমাদের গেট লস্ট বলেন কী করে? এ ভাবে আপনি আমাদের বেরিয়ে যেতে বলতে পারেন না৷’ ডেরেকরা বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে কমিশন।
তৃণমূলের অভিযোগ, ফুলবেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে ছ’টি বিষয় উল্লেখ করতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু কথা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞানেশ তৃণমূলের প্রতিনিধিদের বেরিয়ে যেতে বলেন। তবে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল চিৎকার করে কথা বলছিল বলে যে অভিযোগ উঠছে, তা নিয়ে কী বক্তব্য দলীয় নেতৃত্বের? পরে ডেরেক বলেন, ‘উনি জানেন না কার সঙ্গে খেলছেন। এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। উনি শুধু নিজের কথা বলেছেন। আমরা বলেছি, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী ন’টি চিঠি দিয়েছেন। যেগুলোর কোনও প্রাপ্তি স্বীকার কমিশন করেনি। আমরা এও বলেছি যে, যদি নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ এই চিঠিগুলো লিখতেন, তবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অবশ্যই উত্তর দিতেন।’
এই প্রসঙ্গেই ডেরেকের সংযোজন, ‘আমরা বাংলায় নিযুক্ত ৬ জন অফিসারের একটি তালিকা দিয়েছি, যাঁদের সঙ্গে বিজেপির স্পষ্ট এবং প্রমাণিত যোগ রয়েছে। আমরা তালিকার পাশাপাশি ছবির প্রমাণও দিয়েছি। আমরা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) উদাহরণও দিয়েছি, তাঁকে নন্দীগ্রামে বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল।’ এই মর্মেই তৃণমূলের দাবি, নির্বাচন কমিশনের উচিত বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা। যদি কোনও ভিডিয়ো না থাকে, তবে অন্তত বুধবারের বৈঠকে কী হয়েছে তার অডিয়ো প্রকাশ করা হোক। পাল্টা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘কমিশনের অফিসের ভিতরে কী হয়েছে, তা–ই তো স্পষ্ট নয়। তৃণমূল বাইরে এসে যে সব অভিযোগ করছে, তা নিয়ে তাই প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মানে নেই। কারণ, ওরা অনেক মিথ্যে কথাই বলে। দলটাই মিথ্যের উপরে নির্ভর করে আছে।’ কিন্তু কমিশন কি এ ভাবে কোনও রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ করে এ রকম পোস্ট করতে পারে? প্রবীণ সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচার্য বলেন, ‘কমিশনের পোস্ট দেখে আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি৷ কমিশন এ ভাবে একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে নিশানা করতে পারে না৷ এটা অসাংবিধানিক পদক্ষেপ৷ কমিশনের এই পোস্ট একটা প্রচ্ছন্ন হুমকির মতো মনে হচ্ছে৷ দেখে মনে হচ্ছে, কমিশনের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসই হলো প্রধান প্রতিপক্ষ৷’
তাঁর সংযোজন, ‘দেশের ভোট নিয়ামক সংস্থার কাছে সব রাজনৈতিক দলই সমান৷ তারা কাউকে বাড়তি প্রাধান্য দিতে পারে না৷ কমিশনের প্রধান কাজ হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ তৈরি করা৷ কমিশনের এ দিনের পোস্ট কিন্তু তাদের সাংবিধানিক অবস্থানকে দুর্বল করে সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলেই আমার মনে হচ্ছে৷’ এই পোস্টকে হাতিয়ার করে প্রয়োজনে দেশের ভোট নিয়ামক সংস্থার নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইচ্ছে করলে আদালতেও যেতে পারে তৃণমূল— পর্যবেক্ষণ এই সংবিধান বিশেষজ্ঞের৷