এই সময়: রাজ্যের শাসকদল অভিযোগ তোলার পরে বাংলায় পুলিশ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জয়ন্ত কান্তকে সরিয়ে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরানো হয়েছে চার জেনারেল ও পুলিশ অবজ়ার্ভারকেও। তবে এ বার বেনজির ভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বৈঠক চলাকালীন বের করে দেওয়া হলো এক জেনারেল অবজ়ার্ভারকে। শুধু তাই নয়, বাংলার দায়িত্ব থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে খবর।
কমিশন সূত্রের দাবি, বুধবার রাজ্যের আইন–শৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি বৈঠক চলাকালীন সিইসি–র প্রশ্নের জবাব দিতে না–পারায় তাঁকে ভর্ৎসনা করে বৈঠক ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। ভিন রাজ্যের একজন আমলাকে বৈঠক চলাকালীন এ ভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা অবাক করেছে অনেক প্রবীণ আমলা ও পুলিশকর্তাদেরও। যদিও কমিশন সূত্রের দাবি, এ বারের ভোটে আইন–শৃঙ্খলা প্রশ্নে কারও কোনও ধরনের গাফিলতি হোক— সে তিনি রাজ্যের পুলিশ বা আমলা হোন অথবা কমিশনের পাঠানো অবজ়ার্ভার, কাউকেই রেয়াত করা হবে না— এ দিন সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন জ্ঞানেশ।
সূত্রের খবর, এ দিন ভোটমুখী দুই রাজ্য তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের পর্যবেক্ষক ও পুলিশ পর্যবেক্ষকদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। সেখানে বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের অধীনস্থ এলাকার আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে খুঁটিনাটি তথ্য চাইছিল বেঞ্চ। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, সিইসি জ্ঞানেশ পুলিশ অবজ়ার্ভারদের কাছ থেকে জানতে চান, কোচবিহারের বিশেষ করে দিনহাটার বুথগুলির নিরাপত্তা পরিস্থিতি কী অবস্থায় রয়েছে। স্পর্শকাতর বা অতি স্পর্শকাতর বুথগুলির আশপাশ এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (পূর্বতন সিআরপিসি ১৪৪ ধারা) কার্যকর করে ভোট করা সম্ভব কি না, সে ব্যাখ্যাও চান। সেই সময়ে কোচবিহার দক্ষিণের পর্যবেক্ষক, উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের আইএএস অনুরাগ যাদবের কাছ থেকে সিইসি খোঁজ নেন, তাঁর এলাকায় বুথের সংখ্যা কত? সূত্রের খবর, সেই সময়ে অনুরাগ বলেন, ‘আমি বেশি দিন যোগ দিইনি। জেনে আপনাকে জানাতে পারব।’ এতেই ক্ষিপ্ত জ্ঞানেশ কুমার তাঁকে বলেন, ‘গো ব্যাক ইওর হোম অ্যান্ড লিভ দ্য রুম (আপনি মিটিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং নিজের বাড়ি ফিরে যান।’ সূত্রের দাবি, অনুরাগও তাঁকে জবাব দেন, ‘আপনি এ ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। আমি ২৫ বছর ধরে সার্ভিসে রয়েছি।’
এই বৈঠকে তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের সব পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেন। তবে শেষমেশ তামিলনাড়ুর অবজ়ার্ভারদের নিয়ে এ দিন বৈঠক করেননি সিইসি। তাঁদের নিয়ে আলাদা করে বৈঠক হবে বলে সূত্রের খবর। অনুরাগকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরে ওই বিধানসভা কেন্দ্রে নতুন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। আপাতত সিইও মনোজ আগরওয়াল ও বিশেষ পর্যবেক্ষক ওই বিধানসভা কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধান করবেন। সূত্রের খবর, এ দিনের বৈঠকে জ্ঞানেশের সঙ্গে আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক ময়ূরী ভাসুরেরও কিছুটা তর্কাতর্কি হয়েছে। বৈঠকে ময়ূরী বলেন, ‘আমিও একজন আইএএস অফিসার, আমিও আইনটা জানি।’
এ দিনের বৈঠকে বাংলার আইন–শৃঙ্খলার বিষয়টি ফের ওঠে। জ্ঞানেশ পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশে স্পষ্ট বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে হিংসা কোনও ভাবেই মেনে নেব না। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, অতীতে হিংসা ছড়ানোর তাঁদের নিশ্চিত গ্রেপ্তার করতে হবে। পুলিশ অবজ়ার্ভারদের এটা সক্রিয় ভাবে কার্যকর করতে হবে। অতীতে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ যে সমস্ত গুন্ডাদের বিরুদ্ধে রয়েছে তাদের বাউন্ড ডাউন করতেই হবে।’ আরও একটি বিষয় অবজ়ার্ভারদের জানিয়ে দিয়েছে ফুলবেঞ্চ। হিংসা ও রক্তপাতহীন ভোটের লক্ষ্যে ভোটের সময়ে কোনও গোলমালে পুলিশ পর্যবেক্ষকরা প্রয়োজনমতো কেন্দ্রীয় বাহিনী ডেকে নিতে পারেন। সিইসি বলেছেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে কোনও সমস্যা তৈরি হলে ৩০ মিনিটের মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আপনারা ডাকতে পারবেন।’ মালদার মোথাবাড়ির ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশ পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশ করেও আইন–শৃঙ্খলা নিয়ে সিইসি কড়া নির্দেশ দেন পুলিশ পর্যবেক্ষকদের। আগামী দিনে আইন–শৃঙ্খলাজনিত কোনও সমস্যা হলে যাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন অবজ়ার্ভাররা, সেজন্য সমন্বয় বাড়ানোর উপরেও জোর দেন সিইসি। জ্ঞানেশ পুলিশ অবজ়ার্ভারদের উদ্দেশে বলেন, ‘পুলিশ পর্যবেক্ষকরা কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করুন। বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ান। আইন–শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোনও ইস্যু হলেই আপনারা ৩০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। গ্রামের দোকানে চা খেতে যান। জেনারেল অবজ়ার্ভাররাও আরও যোগাযোগ বাড়ান। গ্রামের লোকেদের সঙ্গে কথা বলুন।’