এই সময়: জেল না চিনলে দেশ চেনা হয় না—সাতাশ বছরের সুদীর্ঘ কারাজীবনের অভিজ্ঞতায় বলেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তবে জেল এবং বন্দিদের নিয়ে উদাসীনতাই যেন দস্তুর এ দেশের নাগরিক জীবনে। ভোটের এই ভরা মরশুমেও বাংলার কারাচিত্র নিয়ে শাসক বা বিরোধী, কোনও তরফেরই হেলদোল নেই। আর তাই ৩৫৩ জন থাকার জন্যে নির্দিষ্ট মালদা জেলা সংশোধনাগারে ১০৭৫ জনকে বন্দি করে রাখার বীভৎস ব্যবস্থা বদলের ডাক শোনা যাচ্ছে না নির্বাচনী প্রচারে বা জনপরিসরে আলোচনায়। ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বাংলার জেলে নয় নয় করে ৯০৫ জন বন্দির মৃত্যু, পরের তিন বছরে ১৫২, ১৩৮, ১৪৩ জনের মারা যাওয়া, এমনকী এ বছর শুধু জানুয়ারিতেই ১৩ জনের মৃত্যুর আতঙ্কজনক পরিসংখ্যানও থেকে যাচ্ছে অন্তরালে। কেই বা খোঁজ রাখে রাজ্যের ৬১টি সংশোধনাগারের জন্যে অনুমোদিত রেগুলার মেডিক্যাল অফিসারের পোস্টই মোটে ৩০টি এবং আর তার ২৮টিই শূন্য দীর্ঘদিন ধরে! সব মিলিয়ে অনুমোদিত কারাকর্মীর ৪৭৮৯টি পদের ১৪৬৭টিই ফাঁকা পড়ে। জেলে অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় বাধ্যতামূলক ভাবে নিকটাত্মীয়কে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যে নির্দেশ ২০১৭–য় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট, যার ভিত্তিতে ২০১৮–র ১১ অক্টোবর ন্যূনতম তিন লক্ষ টাকা অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট—তাও ভুলে থাকার সুবিধাজনক অ্যামনেশিয়ায় আক্রান্ত সরকার!
এই বিস্মৃতির পর্দা কিছুটা সরল বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি সব্বার রশিদির ডিভিশন বেঞ্চে জেলখানার হাল নিয়ে চলা মামলার শুনানিতে ইন্টারভেনর এপিডিআর–এর তরফে আইনজীবী রঘুনাথ চক্রবর্তী এবং নন্দিনী চট্টোপাধ্যায় দুর্বিষহ পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রাজ্যের পেশ করা রিপোর্ট দেখে বিচারপতি বসাক তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আট বছর ধরে চলা এই স্পর্শকাতর মামলায় রাজ্যের গা–ছাড়া মনোভাব, সরকারপক্ষের আইনজীবীর গরহাজিরা বা আইনজীবী বদলে যাওয়া নিয়ে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতি। হাল বদলের রোডম্যাপ নিয়ে আদালত জবাব তলব করলে সরকারপক্ষ ভোটের পরে শুনানির সময় চায়। বিচারপতি বসাক বলেন, একি আর এক ধরনের ‘সার’, যেখানে জেলবন্দিদের অধিকার উপেক্ষিত হতে থাকবে ক্রমাগত? ভোটের জন্যে কি জরুরি পরিষেবা শিকেয় উঠবে? ধারণক্ষমতার চেয়ে জেলখানায় অনেক বেশি বন্দি থাকার সমস্যা চলতে থাকলে আদালত বন্দিদের জামিন দিয়ে দেবে বলেও জানিয়ে দেন বিচারপতি।
শেষ পর্যন্ত রাজ্যে প্রথম দফা ভোটের আগেই সরকারকে জবাবদিহি করার নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। ২২ এপ্রিল পরবর্তী শুনানি ধার্য করে আদালত সরকারপক্ষকে জানাতে বলেছে—জেলে উপচে পড়া ভিড় কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, বন্দির অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ প্রদানের কী অবস্থা, শূন্যপদে নিয়োগই বা কত দিনে শেষ করবে সরকার।