• শাহি-আপ্যায়ন করেও নাম বাদ! পদ্মে ক্ষুব্ধ নবীন
    এই সময় | ০৯ এপ্রিল ২০২৬
  • প্রশান্ত ঘোষ, রাজারহাট

    বছর পাঁচেক আগের কথা। ২০২১–এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসেছিলেন রাজারহাট–নিউ টাউনের আদর্শপল্লিতে। মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এলাকার বিজেপি নেতা নবীন বিশ্বাসের বাড়িতে পাত পেড়ে মধ্যাহ্নভোজন সেরেছিলেন তিনি। নবীনের স্ত্রী সুচন্দ্রা নিজের হাতে রান্না করেছিলেন বাসমতি চালের ভাত, সোনামুগ ডাল, ছোলার ডাল, আটার রুটি। ভারত সরকারের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড ওই রকম হাই প্রোফাইল একজন অতিথিকে আপ্যায়ন করতে পেরে খুশিতে ডগমগ হয়েছিলেন নবীন ও সুচন্দ্রা। গত পাঁচ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। বিজেপির তকমা–লাগা মতুয়া–মুখ নবীনের এখন মোহভঙ্গ হয়েছে গেরুয়া শিবিরের প্রতি। এখন তাঁর বক্তব্য, মতুয়াদের পাশে যে দল আছে তাকে ভোট দাও, বিজেপিকে একটিও ভোট নয়।

    কাজী নজরুল ইসলাম সরণির কেষ্টপুর বাগজোলা খালধারের দু'পাশ ধরে নিউ টাউনের যাত্রাগাছি পর্যন্ত বিধাননগর পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ড এবং জ্যাংড়া-হাতিয়াড়া ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দাদের অধিকাংশই পূর্ববঙ্গ থেকে এ দেশে এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই ধর্মবিশ্বাস–পরিচয়ে মতুয়া। এই ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের ঝুলিতে ভরতেই সে দিন বাগজোলা খালপাড়ের আদর্শপল্লিতে মধ্যাহ্নভোজ সেরেছিলেন ভারতীয় রাজনীতির অধুনা 'চাণক্য' অমিত শাহ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা 'সার'–এর ঠেলায় ওই এলাকার বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম ডিলিটেড হয়ে গিয়েছে। নবীনরা তাই ক্ষোভে ফুঁসছেন। আর দুশ্চিন্তা বাড়ছে পদ্ম–শিবিরে।

    নবীনের অভিযোগ, সার-এর জেরে রাজারহাট–নিউ টাউন, রাজারহাট–গোপালপুর, বিধাননগর বিধানসভা মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার মতুয়া ভোটারের নাম তালিকা থেকে ডিলিট হয়ে গিয়েছে। নাম তোলার ক্ষেত্রে বিজেপি কোনও সহযোগিতাই করেনি। তাই বিজেপিকে একটিও ভোট না দেওয়ার ডাক দিয়েছেন নবীন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, 'যাঁরা ১৮-২০ বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস করছেন, ভোট দিয়ে আসছেন, সব নথি জমা দেওয়ার পরেও তাঁদের যেন নিজভূমে পরবাসী বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন বলা হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নাম তুলতে হবে। তালিকায় নাম রেখে নথি চাইতে পারত নির্বাচন কমিশন।' তার বদলে যা হয়েছে, তার প্রতিবাদ জানাতে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচারে নেমেছেন নবীন। মতুয়া মহাসঙ্ঘের নেত্রী মমতাবালা ঠাকুরের নির্দেশে গোটা রাজ্যজুড়েই প্রচার শুরু করেছেন মহাসঙ্ঘের কার্যকরী সভাপতি নবীন। অমিত শাহের সঙ্গে তোলা একাধিক ছবিও সমাজমাধ্যম থেকে তিনি ডিলিট করে দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

    এই নবীন অবশ্য এর আগে ২০১৫–য় বিধাননগর কর্পোরেশনের নির্বাচনে সিপিএমের প্রার্থী হয়েছিলেন। ওই ওয়ার্ডের তৃণমূল প্রার্থী শিবনাথ ভাণ্ডারীর কাছে হেরে যান তিনি। পরে রাজারহাট–নিউ টাউনের তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত বিজেপিতে যোগ দিলে নবীন এবং শিবনাথ, দু'জনই বিজেপিতে যোগ দেন। এখন অবশ্য নবীন তৃণমূল করেন বলে দাবি বিজেপি শিবিরের।

    এই নবীন অবশ্য এর আগে ২০১৫–য় বিধাননগর কর্পোরেশনের নির্বাচনে সিপিএমের প্রার্থী হয়েছিলেন। ওই ওয়ার্ডের তৃণমূল প্রার্থী শিবনাথ ভাণ্ডারীর কাছে হেরে যান তিনি। পরে রাজারহাট–নিউ টাউনের তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত বিজেপিতে যোগ দিলে নবীন এবং শিবনাথ, দু'জনই বিজেপিতে যোগ দেন। এখন অবশ্য নবীন তৃণমূল করেন বলে দাবি বিজেপি শিবিরের।

    পরিসংখ্যান বলছে, রাজারহাট–নিউ টাউনে প্রায় তিন লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৪০ হাজার মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত, যাঁদের মধ্যে ৬ হাজার জনের নাম ডিলিটেড দেখাচ্ছে। রাজারহাট গোপালপুরে ১৮ হাজার মতুয়া ভোটারের মধ্যে ৪ হাজার ডিলিটেড। এই অবস্থায় বড় একটি ভোটব্যাঙ্ক যদি মুখ ঘোরায় তবে তা নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বিজেপি শিবিরের। এই বিক্ষুব্ধ ভোট তৃণমূলের অনুকূলে আসবে বলে মনে করছেন রাজারহাট–নিউ টাউনের তৃণমূল প্রার্থী তাপস চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, 'বিজেপি মতুয়াদের শুধু ব্যবহার করেছে, প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কিছুই করেনি। ওঁরা তৃণমূলের পক্ষেই ভোট দেবেন।'

    মতুয়া ইস্যুকে হাতিয়ার করছে বাম শিবিরও। সিপিএম প্রার্থী সপ্তর্ষি দেবের বক্তব্য, 'মতুয়া সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছে। সার সমস্যায় একমাত্র বামফ্রন্টই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মতুয়ারা বামেদের সঙ্গেই আছেন।' যদিও রাজারহাট–নিউ টাউনের বিজেপি প্রার্থী পীযূষ কানোড়িয়ার দাবি, 'নবীন বিশ্বাস তৃণমূল–ঘনিষ্ঠ। তাঁর কথায় মতুয়ারা প্রভাবিত হবেন না। আমরা দায়িত্ব নিয়ে বলছি, কোনও হিন্দু ও ভারতীয় মুসলিমের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে না।”

  • Link to this news (এই সময়)