এই সময়: বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর অথবা সার) প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে ‘অ্যাজুডিকেশনে’র পরে বাদ পড়েছে ২৭ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম। এর মধ্যে কতজন সংখ্যাগুরু আর কতজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শুধু এই ২৭ লক্ষ নয়, ‘সার’ শুরু হওয়ার পরে বাংলার ভোটার তালিকা থেকে মোট যে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তার প্রভাব কী ভাবে পড়বে ভোটে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। সব রাজনৈতিক দলই বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা ঘেঁটে বুঝে নিতে চাইছে, লাভ–ক্ষতির অঙ্কে কার পাল্লা কতটা ভারী!
রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পর্যবেক্ষণ, ‘সার’ প্রক্রিয়ায় সাকুল্যে যে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখই হিন্দু! অর্থাৎ, বিজেপি নেতারা বারবার ভোটার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার কথা বললেও আসলে বড় অংশের হিন্দু জনগোষ্ঠীই বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের নিশানায় পড়েছে বলে তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি। মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘নাম বাদ’ ইস্যুতে ইঙ্গিতপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছিলেন।
তাঁর দাবি, ‘যে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম আন্ডার অ্যাজুডিকেশনের কথা বলে অবৈধ ভাবে কাটা হয়েছে, তার মধ্যে ১০ লক্ষের বেশি হিন্দু বাঙালির নাম রয়েছে।’ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের আশ্বস্ত করে অভিষেক বলেছিলেন, ‘দলমত নির্বিশেষে আগামী দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাইকে তাঁদের মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবেন। কেউ ভয় পাবেন না, আতঙ্কিত হবেন না।’ এরপরে ‘সার’–এর জেরে সামগ্রিক ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ৯১ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৫৫ লক্ষই হিন্দু— এই পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করে তৃণমূল প্রমাণ করতে চাইছে, নির্দিষ্ট কোনও সম্প্রদায় নয়, ‘সার’–এর প্রভাব পড়েছে বাংলার সব সম্প্রদায়ের মানুষের উপরেই।
তৃণমূলের এক বর্ষীয়ান নেতার কথায়, ‘বিজেপি দাবি করে, হিন্দু জনগোষ্ঠীই তাদের ভোটব্যাঙ্ক। সার–এ বাদ পড়াদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, হিন্দুরাই এই প্রক্রিয়ায় সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।’ বিভিন্ন জেলায় বাদ পড়া ভোটারদের পরিসংখ্যান ঘেঁটে ওই তৃণমূল নেতার প্রশ্ন, ‘নদিয়া জেলায় বহু উদ্বাস্তু হিন্দুর বসবাস। যে ২৭ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তার মধ্যে দু’লাখের বেশি নদিয়া জেলার। একই ভাবে হুগলিতে বাদ পড়েছে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ভোটার। এঁরা সবাই মুসলিম? সবাই জানে, এঁদের বেশিরভাগই হিন্দু। সার প্রক্রিয়ায় শুধু সংখ্যালঘুরাই বাদ পড়েছেন, এই তত্ত্ব ডাহা মিথ্যে।’ শুধু তা–ই নয়, সার্বিক ভাবে নাম বাদে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা উত্তর ২৪ পরগনা জেলাতেও (১০ লক্ষ ৬০ হাজার) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বড় অংশের হিন্দু উদ্বাস্তু ভোটার রয়েছেন বলে মত ওই প্রবীণ নেতার।
তৃণমূলের এই ‘থিয়োরি’ উড়িয়ে দিতে না পারলেও হিন্দুদের পাশে থাকার বার্তা আরও জোরালো ভাবে দিচ্ছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘হিন্দুদের নিয়ে তৃণমূলকে চিন্তা করতে হবে না। তার জন্য নরেন্দ্র মোদী আছেন। যে হিন্দুদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা সিএএ–র মাধ্যমে ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন।’ তবে বহু হিন্দুর নাম যে ‘সার’ প্রক্রিয়ায় পড়েছে, তা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ‘পরিকল্পিত ভাবে তৃণমূল মতুয়া এবং আদিবাসীদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাতে কিছুটা হলেও তারা সফল হয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সার প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি প্রভাবিত এলাকার ভোটারদের নাম কী ভাবে বাদ দেওয়া যায়, তার চেষ্টা হয়েছে। কারণ, তৃণমূল সরকার মতুয়া এবং আদিবাসী বিদ্বেষী।’