বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস খেতে দেবে না! বিধানসভা ভোটের প্রচারে লাগাতার এই মর্মে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে রাজ্যের শাসকদল। তৃণমূলের এই অভিযোগ খণ্ডনে মাছবাজারে প্রচারে যেতে শুরু করেছেন বাংলার বিজেপি নেতারা। দলীয় প্রার্থীদের কেউ কেউ আবার দড়িতে বাঁধা প্রকাণ্ড কাতলা ঝুলিয়েও রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন। দলের এই ভাষ্যকে আরও জোরালো করে তুলতে এ বার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আসরে নামলেন। মৎস্য উৎপাদনে বাংলা পিছিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, মাছ নিয়ে আর ফিসফাসের প্রয়োজন নেই! দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে বাংলার নেতারা নিজেদের মৎস্যপ্রেমের দৃশ্য তৈরি করতেই পারেন। তাতে অন্তত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনও আপত্তি নেই।
বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায় মোদীর সভা ছিল। সেই সভা থেকেই বাংলার মৎস্যচাষ নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ‘এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাছের উৎপাদনে এখনও পিছিয়ে বাংলা। অন্য রাজ্য থেকে আমদানি করতে হয়।’ প্রধানমন্ত্রীর দাবি, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে মৎস্য উৎপান বেড়েছে। বিহারে মৎস্য উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু তৃণমূল সরকারের কারণে বাংলা মৎস্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন মোদী। তাঁর দাবি, ‘তৃণমূল সরকারের কারণেই পিএম মৎস্য সম্পদ প্রকল্পের লাভ পান না বাংলার মৎস্যজীবীরা।’
কিছু ক্ষণের মধ্যেই মোদীর এই মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তর ২৪ পরগনার মিঁনাখায় তাঁর সভা ছিল। সেখানে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘মৎস্য উৎপাদনে বাংলা স্বাবলম্বী। এখন আর অন্ধ্র থেকে মাছ আনতে হয় না।’ মমতা জানান, এখন বাংলায় ইলিশেরও চাষ হয়।
ভোটের প্রচারে বিজেপিকে বাঙালি বিরোধী বলে চিহ্নিত করতে ক্রমেই তৎপরতা বাড়াচ্ছে তৃণমূল। সেই সূত্রেই মমতা-অভিষেকের অভিযোগ, বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি বোঝে না! ক্ষমতায় এলে তারা বাঙালিকে মাছ-ভাতও খেতে দেবে না। অনেকের মত, তৃণমূলের এই অভিযোগ পুরোপুরি অমূলকও নয়। কারণ, গত দিল্লিতে ক্ষমতা দখলের পরেই সিআর পার্কে মাছের বাজার বন্ধের অভিযোগ উঠেছিল বিজেপির বিরুদ্ধে। তা নিয়ে সেই সময় সুরও চড়িয়েছিল তৃণমূল। মধ্যপ্রদেশেও বছর দুয়েক আগে খোলাবাজারে মাছ-মাংস-ডিম বিক্রির উপর বিধিনিষেধ জারির অভিযোগ ওঠে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে। গত কিছু বছরে দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের দুর্গাপুজোর প্রাঙ্গণে আমিষ খাবারের স্টল কেন থাকবে, তা নিয়েও মণ্ডপ কর্তাদের সঙ্গে বিবাদে জড়াতে দেখা গিয়েছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে। এই সব অভিযোগকে হাতিয়ার করেই বাংলায় ভোটের প্রচারে নেমেছে তৃণমূল।
কিন্তু বিজেপিও বিলক্ষণ জানে, মাছে-ভাতে বাঙালির মন পেতে তৃণমূলের এই অভিযোগ খণ্ডন করা প্রয়োজন। সেই কারণেই ভোটে প্রার্থী নন, এমন বিজেপি নেতারাও মৎস্যপ্রেম-মাংসপ্রেম সম্প্রতি প্রকাশ্যে ব্যক্ত করা শুরু করেছেন। এতে যে তাঁরও সায় রয়েছে, সে কথা প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিলেন মোদীও। সারা বিশ্বে মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারতবর্ষ। তথ্য বলছে, তবে দেশের মধ্যে মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্রপ্রদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। সেই পশ্চিমবঙ্গে সামুদ্রিক এবং মিষ্টি জলের মাছ উৎপাদন ও রপ্তানিতে এগিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর। তৃণমূলের অভিযোগের জবাব দিতে সুকৌশলে সেই জেলাকেই বেছে নিলেন মোদী। জেলার একাংশের মত, ২০২১ সাল থেকে বিধানসভা, পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং গত বছর লোকসভাতেও উপকূলের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে মৎস্যজীবী অধ্যুষিত এলাকায় পদ্ম ফুটেছে। এ বার মৎস্যচাষ নিয়ে কথা বলে বিজেপি সেই ভিত আরও শক্ত করতে চাইছে।