বৃহস্পতিবার ভোররাতে পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম এলাকায় ভাগীরথী নদীতে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনা। বালি বোঝাই একটি নৌকা হঠাৎ উল্টে যাওয়ায় প্রাণ হারালেন অন্তত দু’জন শ্রমিক। এই দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদের মধ্যে একজনের নাম গণেশ মণ্ডল (৫২)। অন্য মৃত ব্যক্তির পরিচয় এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। দু’জনেরই বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা এলাকায় বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোরের অন্ধকারে ভাগীরথী নদী থেকে বালি তুলে ফিরছিল একটি নৌকা। ওই নৌকায় মাঝি–সহ মোট ১১ জন শ্রমিক ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নদী থেকে বালি তোলার পর ফেরার পথে আচমকাই নৌকাটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং মুহূর্তের মধ্যে উল্টে যায়। এর ফলে নৌকায় থাকা সকল শ্রমিক নদীতে পড়ে যান।
দুর্ঘটনার পরপরই চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষজন ছুটে আসেন। স্থানীয় ঘাটের মাঝি ও টোটো চালকরা ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে। তাঁদের তৎপরতায় নয় জন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে বাকি দু’জনকে আর বাঁচানো যায়নি। নদীর জলে তলিয়ে গিয়ে তাঁদের মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান।
উদ্ধারকার্যের সময় এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। জানা গিয়েছে, এক শ্রমিক নৌকার ইঞ্জিনের পাখায় আটকে গিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হন। তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে নৌকার একটি অংশ কেটে ফেলতে হয়। অন্যদিকে, আরেকজন শ্রমিক নৌকার ভিতরে থাকা বালির নিচে চাপা পড়ে মারা যান। এই দৃশ্য উদ্ধারকারীদেরও স্তম্ভিত করে দেয় এবং দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত শ্রমিকদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্থানীয়দের দাবি, অবৈধভাবে বালি তোলার কাজ বহুদিন ধরেই চলছিল এই এলাকায়। ভোররাতে বা গভীর রাতে এই কাজ করা হয় যাতে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজই এবার দুই শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নিল। এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাগীরথী নদীতে অবৈধ বালি তোলা বন্ধে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। বারবার এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, নৌকাটি অতিরিক্ত বালি বোঝাই ছিল কি না এবং অবৈধ বালি তোলার সঙ্গে কারা যুক্ত–সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, শুধু তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, অবৈধ বালি তোলার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভাগীরথী নদীতে বালি বোঝাই নৌকা উল্টে দুই শ্রমিকের মৃত্যুর এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, অবৈধ কাজের ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এখন দেখার, প্রশাসন এই ঘটনার পর কতটা কড়া ব্যবস্থা নেয় এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা রুখতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।