• প্রশান্ত মহাসাগরে ঘনাচ্ছে বিরল ‘সুপার এল নিনো’, পৃথিবী জুড়ে আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা
    এই সময় | ১০ এপ্রিল ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    ১৯৮২–৮৩’র পরে ১৯৯৭–৯৮ এবং তার পরে ২০১৫–১৬ — ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজ়েশন (ডব্লিউএমও)–এর হিসেব অনুযায়ী, গত ৪৪ বছরে তিন বার ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখেছে পৃথিবী। এই তিন বছরের মধ্যে সর্বশেষ অর্থাৎ ২০১৫-১৬–এর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে গড় তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। এ বছর ফের প্রশান্ত মহাসাগরে তেমনই এক ‘সুপার এল নিনো’–র প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানাচ্ছেন ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)–এর বিজ্ঞানীরা। ফলে সামনের বেশ কয়েক মাস শুধু ভারত নয়, গোটা পৃথিবীর আবহাওয়াতেই বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন তাঁরা।

    এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পার করে ফেলার পরেও দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মাত্র দু’দিন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে পৌঁছেছে। কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এখনও পর্যন্ত ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর ছাড়ায়নি। মার্চে আট দিন এবং এপ্রিলে এখনও পর্যন্ত ছ’দিন বৃষ্টি, তার সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ–সহ ঝড়ের সৌজন্যে মোটের উপরে মনোরমই রয়েছে আবহাওয়া। অনেকেই তাই আশা করছেন, এ যাত্রায় হয়তো এমন ভাবেই গ্রীষ্মের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সেই আশাবাদীদের স্বপ্নভঙ্গ শুধুই সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরে ইতিমধ্যেই যে ‘সুপার এল নিনো’ ঘনিয়ে উঠছে, তার প্রভাব ২০২৬–এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

    পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আবহবিদদের নিয়ে তৈরি একাধিক সংস্থার তৈরি মডেল যে পূর্বাভাসে দিচ্ছে, তার ভিত্তিতে বলা যায়, এই বিরল ‘সুপার এল নিনো’ মৌসুমি বায়ুর প্রবাহকে ব্যাহত করতে, নিরক্ষীয় ঝড়ের গতিপথ পরিবর্তন করতে এবং এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিশাল এলাকায় বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আবহবিদদের মতে, ‘এল নিনো’ হলো আবহাওয়ার এক উষ্ণ পর্যায়। এই ঘটনা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের উপরে ‘ট্রেড উইন্ড’ বা বাণিজ্য বায়ুর প্রবাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে মহাসাগরের উষ্ণ জল আর পশ্চিম দিকে সরে যেতে পারে না এবং ঠান্ডা জল তার জায়গা নিতে পারে না। তারই পরিণতিতে মহাসাগরের একটা বিরাট এলাকা জুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে ওঠে। এই উচ্চ তাপমাত্রা ও দুর্বল বায়ুপ্রবাহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা রকমের প্রভাব ফেলে।

    সাধারণত ‘এল নিনো’ পরিস্থিতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবজনিত বৃষ্টির পরিমাণ কমে যায় এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুতে বৃষ্টি বাড়ে। ফলে একদিকে গরমে গড় তাপমাত্রা চড়া থাকে, অন্য দিকে শীতেও ঠান্ডার প্রকোপ কম থাকে। আর সেই ‘এল নিনো’ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হলে তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলে। ‘এল নিনো’ সাধারণত বিশেষ একটি অঞ্চলের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। কিন্তু ‘সুপার এল নিনো’ পৃথিবীর অনেকটা অঞ্চলের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে।

    আবহবিদরা জানাচ্ছেন, ২০২৬–এর ‘সুপার এল নিনো’ পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তাকে ‘ক্লাইমেট রেজিম শিফট’ (সিআরএস) বলা হয়। এর প্রভাবে জলবায়ুর স্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে হঠাৎ এমন দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটে যা বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৬–এর ৬ এপ্রিল এনওএএ জানিয়েছে, জুন থেকে অগস্টের মধ্যে এই ‘সুপার এল নিনো’ তৈরির সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ইসিএমডব্লিউএফ)–এর বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গত একশো বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’ হতে চলেছে। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হতে চলেছে। এর প্রভাবে বড় বন্যা, মারাত্মক খরা ও ঝড়ের গতিপথে পরিবর্তনের মতো চরম আবহাওয়া অনেক বেশি করে দেখা যাওয়ার আশঙ্কা।

  • Link to this news (এই সময়)