• বাদ পড়া ৬৩% হিন্দুই, দাবি তৃণমূলের, প্রশ্ন পদ্মে
    এই সময় | ১০ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: বঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে যে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজন সংখ্যাগরিষ্ঠ ও কত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ— তা নিয়ে চুলচেরা হিসেব চলছে শাসক ও বিরোধী শিবিরে। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে একেবারে শেষ দফায় ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম। এর জেরে বিভিন্ন জেলায় আতঙ্কিত–উদ্বিগ্ন ভোটারদের লম্বা লাইন পড়ছে জেলাশাসক, মহকুমা শাসক বা বিডিও অফিসে নথি জমা দেওয়ার জন্য। সেই লাইনে হত্যে দিতে গিয়ে বৃহস্পতিবার নদিয়ার রানাঘাটে মৃত্যু হলো বছর আটষট্টির এক বৃদ্ধের। জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস নামে ওই বৃদ্ধের বাড়ি হাঁসখা‍লির বগুলা এলাকায়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও আতঙ্কের কারণেই মারা গিয়েছেন তিনি। বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এ ভাবে আতঙ্ক, উদ্বেগের কারণে অন্তত দু’শো জনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের। তবে ট্রাইব্যুনালের নথি জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর ঘটনা এই প্রথম। এই মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েনের আবহেই যে প্রশ্নটা জোরালো ভাবে উঠে আসছে, তা হলো ‘বিচারাধীন‍’ ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে বাদ পড়া ২৭ লক্ষ ভোটার কারা? মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গের নির্বাচনী সভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, এই ২৭ লক্ষের মধ্যে ১০ লক্ষ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ গিয়েছে। বুধবার আবার তৃণমূল সূত্রে দাবি করা হয়, সার্বিক ভাবে যে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৫৫ লক্ষের মতো হিন্দু ভোটার রয়েছেন। বৃহস্পতিবার দলীয় সূত্রে নতুন একটি পরিসংখ্যান সামনে আনা হয়েছে, যেখানে খসড়া তালিকা, চূড়ান্ত তালিকা এবং সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে— কোন পর্বে কত নাম বাদ গিয়েছে এবং তাতে কত হিন্দু বা মুসলিম ভোটার রয়েছেন তার একটি তথ্য রয়েছে। নির্বাচন কমিশন এখনও পর্যন্ত সম্প্রদায় ভিত্তিক কতজনের নাম কোন পর্বে বাদ গিয়েছে, তার কোনও পরিসংখ্যান জানায়নি। তবে এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সব মিলিয়ে বাদ পড়া ৯১ ‍লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৬৩.৪২ শতাংশ হলেন হিন্দু ও ৩৪.৩২ শতাংশ হলেন মুসলিম। এই তথ্যের ভিত্তিতে তৃণমূলের অভিযোগ, ‘নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি চক্রান্ত করে সব সম্প্রদায়ের মানুষের নাম বাদ দিয়েছে এবং ভোটগ্রহণের মাত্র ক’দিন আগে পর্যন্ত হেনস্থা করে চলেছে।’ যদিও বিজেপি এই পরিসংখ্যানের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

    প্রত্যাশিত ভাবে এ নিয়ে চাপানউতোরের মধ্যে নদিয়ার বৃদ্ধের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন জোড়াফুল নেতৃত্ব। জীবনকৃষ্ণের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছন তৃণমূলের নদিয়া দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়–সহ জেলা নেতারা। এই ঘটনার প্রতিবাদে এ দিন দুপুরে রানাঘাটে ১২ জাতীয় সড়কের সার্ভিস রোডে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ বিক্ষোভও দেখায় তৃণমূল। তাতে সামিল হন রানাঘাট দক্ষিণ ও রানাঘাট উত্তর–পশ্চিমের দুই তৃণমূল প্রার্থীও। জীবনকৃষ্ণের পরিবার সূত্রের খবর, তাঁর চার মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে পরিযায়ী শ্রমিক। ভোটার লিস্টে পরিবারের অন্যদের নাম থাকলেও জীবনকৃষ্ণ ও তাঁর এক মেয়ের নাম বাদ পড়েছিল। এক মেয়ে চম্পা বিশ্বাস বলেন, ‘এ দিন সকালে বাবাকে নিয়ে বগুলা থেকে ট্রেনে রানাঘাট আসি। এসডিও অফিসে কাগজপত্র জমা করার জন্য ১০টা নাগাদ বাবা লাইনে দাঁড়ালেও একটু বসতে চাইছিলেন। পাশে একটা জায়গায় ওঁকে বসিয়ে আমি কাগজপত্র গোছাচ্ছিলাম। তার মধ্যেই আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন দেখে দ্রুত রানাঘাট হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু বাঁচাতে পারিনি।’

    এই ঘটনার পাশাপাশি পরিসংখ্যান তুলে ধরে তৃণমূলের যুক্তি, ‘সার’–এর খসড়া তালিকার সময়ে যে প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪৪ লক্ষই হিন্দু এবং ১৩ লক্ষের মতো মুসলিম। চূড়ান্ত লিস্টে যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ নাম বাদ যায়, তাঁদের মধ্যেও ৫ লক্ষ ২৮ হাজারের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। আবার বাদ পড়া ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের মধ্যে ১৭ লক্ষের বেশি মুসলিম ভোটার রয়েছেন। তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী এ দিন বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা খুঁজতে গিয়ে বিজেপি সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে। সেই হয়রানি থেকে বাদ যাননি গরিব হিন্দুরাও। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ৫৭ লক্ষেরও বেশি হিন্দু নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছে।’

    এই তথ্য–পরিসংখ্যান যে বিজেপির পক্ষেও অস্বস্তিকর, তা স্পষ্ট দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক একাধিক মন্তব্যে। যেখানে তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপির সংগঠন নয়। ইচ্ছাকৃত ভাবে, পরিকল্পিত ভাবে নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদে যেখানে মতুয়া, হিন্দু উদ্বাস্তু বা আদিবাসী ভোট রয়েছে, যার বেশির ভাগ ভোট বিজেপি পায়, সেই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ, বিজেপি যে ফর্ম–৭ জমা দিয়েছিল সেগুলোর কোনও হিসেব নেই। এই বিষয়টি তাঁরা কমিশনের কাছে তুলে ধরছেন।

    সার্বিক ভাবে কমিশন সম্পর্কে শমীকরা এই অভিযোগ তু‍ললেও তৃণমূলের তরফে যে পরিসংখ্যান পেশ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে রাজ্য বিজেপির।

    বঙ্গ–বিজেপির একাংশের যুক্তি, খসড়া তালিকায় মৃত, অনুপস্থিত, ডুপ্লিকেট ও স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত যে ৫৭ লক্ষের নাম বাদ পড়েছিল, তার মধ্যে হিন্দু–মুসলিম সব সম্প্রদায়ের মানুষই আছেন। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই হিন্দুদের সংখ্যা বেশি থাকবে। তারপরে কত নাম বাদ গেল, সেটাই দেখা দরকার। এক বিজেপি নেতার বক্তব্য, ‘অ্যাজুডিকেশনের পরে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে উত্তর–২৪ পরগনা, মালদা, মুর্শিদাবাদ জেলায়। এই জেলাগুলি মুসলিম প্রভাবিত। তা হলে এই জেলাগুলোতে হিন্দুদের নাম সবচেয়ে বেশি বাদ গিয়েছে বলে তৃণমূল যে প্রচার করছে, তা সত্যি হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে কী করে? এই রকম কোনও তথ্য তো কমিশন দেয়নি।’ কমিশন বিধানসভা ভিত্তিক ‘অ্যাজুডিকেশন’ থাকা ভোটারদের মধ্যে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তার তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই অনুযায়ী, ‘অ্যাজুডিকেশনে’ সব থেকে ভোটার বাদ পড়েছেন মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে (৭৪,৭৭৫)। এরপরে রয়েছে রঘুনাথগঞ্জ (৪৬,১০০), ফরাক্কা (৩৮,২২২), সূতি (৩৭,৯৬৫) এবং কলকাতার কাছেই মেটিয়াবুরুজ (৩৯,৫৭৯) ও রাজারহাট–নিউ টাউন (২৪,১৩২)। এই এলাকাগুলির একটি বড় অংশ সংখ্যালঘুপ্রবণ বলেই দাবি পদ্মের। বিজেপি নেতা শিশির বাজোরিয়ার কথায়, ‘আমরা চেয়েছিলাম ভোটার লিস্ট থেকে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ যাক। সেটাই গিয়েছে। অনুপ্রবেশকারী কারা সেটা বুঝতে হবে।’ আর এক বিজেপি শীর্ষ নেতার বক্তব্য, ‘যদি হিন্দু ভোটার বেশি বাদ গিয়েছে, এটা প্রচার করেই তৃণমূল খুশি হয়, তা হলে ওরা খুশি থাক।’

  • Link to this news (এই সময়)