বাসুদেব ভট্টাচার্য, মেখলিগঞ্জ
তিনি আছেন। কিন্তু, সামনে নয়। প্রচারের আড়ালে।
সামনে আছেন এক সিনিয়র নেতা। বাম আমলের মন্ত্রী। ঘাম ঝরাচ্ছেন জোড়াফুলের ব্যাজ বুকে এঁটে। নিজের ছায়ার বিরুদ্ধেই যেন লড়ছেন তিনি। তার উপরে বিজেপির চ্যালেঞ্জ। সবমিলিয়ে কঠিন লড়াই পরেশ অধিকারীর।
মেখলিগঞ্জের বিদায়ী বিধায়ককে এ বার তৃণমূল টিকিট দেবে কি না, তা নিয়ে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল। শিক্ষা দুর্নীতিতে সরাসরি জড়িয়ে গিয়েছে অধিকারীর পরিবারের নাম। পরেশ বার বার কেন্দ্রীয় সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন। তাঁর মেয়েকে এ জন্য চাকরি হারাতে হয় আদালতের নির্দেশে। তবু প্রবীণ নেতাতে আস্থা রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আস্থা রক্ষার লড়াই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে শিক্ষা দুর্নীতির লম্বা হতে-থাকা ছায়া অধিকারীদের বাড়ির পাঁচিল ডিঙিয়ে পুরো মেখলিগঞ্জ বিধানসভাকে ঢেকে ফেলায়!
তাই তিনি আছেন। কিন্তু, প্রকাশ্যে নয়। আড়ালে। তিনি অঙ্কিতা অধিকারী। প্রবীণ নেতার কন্যা।
মেঘনাদের মতো লোকচক্ষুর বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার সামলাচ্ছেন অঙ্কিতা। সাংবাদিকদের নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছেন তিনি। সেখানে বাবার প্রতিদিনের কর্মসূচির ছবি, ভিডিয়ো নিয়মিত আপলোড করছেন।
দুর্নীতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে ওঠেনি। তবু কোনও ঝুঁকি নিচ্ছেন না পরেশ। গত নির্বাচনে বাবার পাশে দেখা গিয়েছিল অঙ্কিতাকে। এ বার তিনি উধাও। অথচ চাকরি যাওয়ার পরেও অঙ্কিতাকে কোচবিহার জেলায় সাধারণ সম্পাদিকা পদ দিয়েছিল তৃণমূল। মাস ছয়েক আগে অবশ্য দলের জেলা কমিটি তৈরির সময়ে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। তার পরেও পরেশ-কন্যাকে তৃণমূলের বিভিন্ন মিছিল–মিটিংয়ে দেখা গিয়েছে। 'সার'–বিরোধী মিছিলেও ছিলেন। তা হলে ভোট আসতেই নিজেকে কেন গুটিয়ে নিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বিজেপির প্রচারে। তারা সব জায়গায় 'চাকরি চুরি'র দায়ে নিশানা করছে পরেশকে। বিজেপির জলপাইগুড়ির জেলা সাংগঠনিক সভাপতি শ্যামল রায় বলেন, 'শিক্ষা দুর্নীতির প্রথম দাগি আসামি পরেশচন্দ্র অধিকারী। এতে তাঁর মেয়েও সামিল। তৃণমূল অপরাধীদের দল বলে তাঁকে প্রার্থী করেছে।' এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি পরেশ। অঙ্কিতা শুধু বলেন, 'অন্যরা যে ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করছেন, আমিও তা–ই করছি।'
এই বিতর্কের কারণে তৃণমূলের একটা অংশ চেয়েছিল যাতে পরেশকে আর টিকিট না দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেখলিগঞ্জের এক তৃণমূল নেতা বলেন, 'অঙ্কিতা প্রকাশ্যে প্রচার করলে হয়তো তার একটা প্রভাব পড়তে পারে। এখন তিনি দুর্নীতি মামলায় জামিনে আছেন। সাধারণ মানুষ ভালো ভাবে নাও নিতে পারেন। তাই তাঁকে প্রচারে আনা হচ্ছে না।'
গত বার ১৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন পরেশ। এই ব্যবধান ধরে রাখতে ছুটছেন তিনি। আপাতত মেয়ের শূন্যস্থান পূরণ করছেন পরেশের স্ত্রী। মীরারানি অধিকারী অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী। তিনি পথেঘাটে স্বামীর হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। সে সব ছবি পোস্ট করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু কোনও ফ্রেমে নেই অঙ্কিতা। দুর্নীতি নিয়ে এতই যদি ভয়, তা হলে প্রার্থী বদল হলো না কেন?
টিকিট দেওয়ার বিষয়টা শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে, এ কথা বলছেন জেলার সিনিয়র তৃণমূল নেতারা। দলের কোচবিহার জেলা চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন বলেন, 'বিজেপি অপপ্রচার চালাচ্ছে। মানুষ ওদের ছুড়ে ফেলে দেবে। পরেশ অধিকারী তাঁর প্রচারে কাকে নেবেন, কাকে নেবেন না, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়।' তাই কি বাবার মনোনয়ন পেশের সময়েও পাশে দেখা যায়নি অঙ্কিতা অধিকারীকে? এই স্বেচ্ছা-অন্তরালের বিনিময়ে তিনি কি ভোঁতা করে দেবেন বিজেপির দুর্নীতি-অস্ত্র?
উত্তর পাওয়া যাবে ৪ মে।