এই সময়: ভারতের স্বাস্থ্য মানচিত্রে এক নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। জীবনযাপনজনিত অসুখ-বিসুখ এখন আর শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কম বয়সেই তা উদ্বেগজনক ভাবে ছড়াচ্ছে, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগাম ধরা পড়ছে না। অ্যাপোলো হাসপাতাল গোষ্ঠীর করা ‘হেলথ অফ দ্য নেশন ২০২৬’ সমীক্ষায় সমীক্ষায় উঠে এসেছে এই চিত্র। ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের তুলনায় তুলনামূলক ভাবে কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও, রক্তাল্পতার সমস্যা গভীরতর পূর্ব ভারতে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গও রয়েছে।
মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এই রিপোর্টে ২০২৫ সালে দেশের ১০টি বড় শহরে ৩০ লক্ষেরও বেশি প্রিভেন্টিভ হেলথ চেক-আপে আসা রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্ট তৈরি করেছে দেশের বৃহত্তম ওই বেসরকারি হাসপাতাল গোষ্ঠী। তাতে দেখা গিয়েছে— ডায়াবিটিসের হার সবচেয়ে বেশি মাদুরাইতে (৩৬%), উচ্চ রক্তচাপ মাইসোরে (৪৪%), অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা গুয়াহাটিতে (৩৯%) এবং স্থূলতা বা ওবেসিটি তিরুচিরাপল্লিতে (৮৪%) সর্বাধিক।
ইয়ং ইন্ডিয়া-ই সবচেয়ে ঝুঁকিতে
রিপোর্ট বলছে, ৩০ বছরের নীচে প্রতি ৫ জনে ১ জন প্রি-ডায়াবিটিসে আক্রান্ত।
আরও উদ্বেগজনক, এই বয়সীদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের শরীরে অন্তত একটি ‘নীরব’ সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে।
অন্তত ৫০% তরুণ-তরুণী অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন।
প্রায় ৭০% ভিটামিন ডি এবং ৫০% ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিতে আক্রান্ত।
কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যেও প্রায় অর্ধেক কোনও না কোনও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া-তেও একই ছবি
গড় বয়স মাত্র ৩৮ হলেও কর্মজীবী ও শ্রমজীবী ভারতের ছবিতেও উদ্বেগ স্পষ্ট।
প্রায় ৮০% মানুষ স্থূলতা, ৫০% ডায়াবিটিস বা প্রি-ডায়াবিটিস এবং ২৫% উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
কর্মক্ষম বয়সেই লাইফস্টাইল ডিজ়িজ় দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা।
পূর্ব ভারত ও পশ্চিমবঙ্গেও বাড়ছে শঙ্কা
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে অ্যানিমিয়ার হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
কলকাতায় ডায়াবিটিসের হার ১৯% এবং উচ্চ রক্তচাপের হার ২৯% প্রায়। স্বস্তির হলো, এগুলি জাতীয় গড়ের চেয়ে কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বৈষম্যই এর মূল কারণ।
নীরব ঘাতকেই সবচেয়ে বড় শঙ্কা
অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই কোনও পূর্বলক্ষণ নেই।
ফ্যাটি লিভারের ৭৪% ক্ষেত্রে রক্তপরীক্ষা স্বাভাবিক, কিন্তু আল্ট্রাসাউন্ডে ধরা পড়ছে সমস্যা।
৪৫% আপাত-সুস্থ মানুষের শরীরে হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণ মিলছে।
প্রতি ১০ জনে ১ জন উদ্বেগ এবং ১৫ জনে ১ জন অবসাদে ভুগছেন।
মহিলাদের ক্ষেত্রে আলাদা ঝুঁকি
২০–২৯ বছরে ভিটামিন বি১২ ঘাটতি, ৪০ পেরোলে ৯০% ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন।
মেনোপজ়ের পর ডায়াবিটিসের ঝুঁকি ২.৫ গুণ বাড়ছে।
৪০ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের মধ্যে ৩৫৯ জনে ১ জনের স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ছে, যাঁদের গড় বয়স ৫১। পশ্চিমী দেশগুলির তুলনায় এই বয়স প্রায় ১০ বছর কম।
কী বলছেন চিকিৎসকরা
অ্যাপোলো গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, চিকিৎসক প্রতাপ সি রেড্ডি বলেন, ‘একটি দেশের শক্তি তার মানুষের স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। এখন সময় প্রো-অ্যাক্টিভ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার।’
সংস্থার এগজ়িকিউটিভ ভাইস চেয়ারপার্সন, চিকিৎসক পৃথা রেড্ডির মতে, মহিলাদের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
অ্যাপোলো গোষ্ঠীর জয়েন্ট ম্যানেজিং ডিরেক্টর, চিকিৎসক সঙ্গীতা রেড্ডি জানান, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হবে প্রেডিক্টিভ বা পূর্বানুমানভিত্তিক, পার্সোনালাইজ়ড বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং ডায়নামিক বা ধরাবাহিক।
আশার দিকও রয়েছে
নিয়মিত চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ৫৬% ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ এবং ৩৪% ক্ষেত্রে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সময়মতো হস্তক্ষেপ (মেডিক্যাল ইন্টারভেনশন) করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব— এই বার্তাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এই রিপোর্টে।