এই সময়: ২০১৬–য় বিধানসভা নির্বাচনের আগে নারদ স্টিং অপারেশনের জেরে বিতর্ক শুরু হয়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। সেই বিতর্কের আইনি অবসান এখন হয়নি। দশ বছর পরে ২০২৬–এর নির্বাচনের ঠিক আগে আরও একটি স্টিং অপারেশন সামনে আসায় ফের নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে শাসক এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে। বৃহস্পতিবার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়। যেখানে দেখা এবং শোনা যাচ্ছে, মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ নির্মাণকে সামনে রেখে হুমায়ুন কবীর বিজেপির সঙ্গে ১০০০ কোটি টাকার ডিল করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। সেই ডিলে বিজেপি যদি রাজ্যে সরকার গড়তে পারে তা হলে ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দরকষাকষিও করেছেন ভরতপুরের বিধায়ক।
তৃণমূল ভবনে বৃহস্পতিবার ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস সহ তৃণমূল নেতৃত্ব হুমায়ুনের সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির কথোপকথনের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে গুরুতর এই অভিযোগ করেন। ওই ভিডিয়োর সত্যতা ‘এই সময়’ যাচাই না করলেও সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রায় ১৯ মিনিটের ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। তৃণমূল ভবনে ফিরহাদ হাকিম, অরূপের উপস্থিতিতে যে ভিডিয়ো দেখানো হয় সেখানে হুমায়ুনের কথায় পিএমও, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নাম বলতে শোনা গিয়েছে। ছবিতে দেখতে না পাওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথায় কথায় হুমায়ুন বলছেন, ‘আমি ১০০০ কোটি চাইছি। এর মধ্যে ৩০০ কোটি রেখে দেব।’ ওই টাকা কী ভাবে বিধানসভা ভিত্তিক খরচ করা হতে পারে সেই বিষয়েও হুমায়ুনকে মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে। ভোট–যুদ্ধে হুমায়ুন কী ভাবে নামতে চেয়েছিলেন তার বিবরণ দিতে গিয়ে ওই ভিডিয়োতে তিনি বলেছেন, ‘অসমের মুখ্যমন্ত্রী এই দায়িত্বে ছিলেন... পরে পিএমও মোহন যাদবের সঙ্গে কথা চালাতে বলে...বিজেপি ১০০–১২০ পর্যন্ত যেতে পারে কিন্তু ১৪৮ আসন পাবে না। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যতবার কথা হয়েছে, আমি একই কথা বলেছি। শুভেন্দুর সঙ্গে মোহন যাদবেরও কথা হয়েছে, ৭০–৮০ টি আসনে জিতলে ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে দেবে।’ এই ভিডিয়োতে একটি প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ুন এটাও বলেছেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, তিনি দিল্লি যাবেন এবং বাংলার ইলেকশন হেডের সঙ্গে দেখা করাবেন।’
তৃণমূল ভবনে এই ভিডিয়ো দেখিয়ে ফিরহাদ অভিযোগ করেন, ‘আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কী ভাবে হুমায়ুন বাবরি মসজিদের নামে মুসলিম আবেগকে বিক্রি করে ১০০০ কোটি টাকা চাইছেন। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যবহার করে ভোট কেনা-বেচায় লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের লজ্জা হওয়া উচিত। আমি হুমায়ুনকে চিনি, সে কারণে আমি এখানে বসে ওকে সাসপেন্ড করে দল থেকে বের করে দিয়েছিলাম।’
আমজনতা উন্নয়ন পার্টির নেতার কথোপকথনের ভিডিয়ো বড় কেলেঙ্কারির প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত দাবি করেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। যদিও হুমায়ুনের যুক্তি, ‘পরিকল্পনা করে এটা করা হয়েছে। তৃণমূল ভয় পেয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি করা ভিডিয়ো। আমাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছে। আমি মানহানির মামলা করব। বিজেপির কোনও নেতার সঙ্গে কোনও লেনদেন করেছি এটা প্রমাণ করতে হবে।’ ভিডিয়োতে হুমায়ুন একাধিকবার শুভেন্দুর নাম উল্লেখ করায় রাজ্যের বিরোধী দলনেতা এ দিন বলেন, ‘ওই ভিডিয়োতে আমার নাম কয়েকবার এসেছে। ভিডিয়োটি এআই দিয়ে তৈরি করা কি না, তা সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাব থেকে দেখা উচিত। হুমায়ুনের উচিত সিবিআই তদন্ত দাবি করা। মধ্যপ্রদেশ সরকারেরও উচিত বিশেষ তদন্ত করা।’ তৃণমূল নেতৃত্ব আর্থিক লেনদেনের তদন্ত দাবি করায় শুভেন্দু বলেন, ‘রাজ্য সরকার এর তদন্ত সিবিআই–র হাতে তুলে দিক। সিবিআই যদি মনে করে এখানে আর্থিক কেলেঙ্কারি রয়েছে, তা হলে ইডির হাতে তদন্তভার তুলে দেবে।’
যদিও তৃণমূল নেতৃত্বর বক্তব্য, ভোটে পরাজয় নিশ্চিত অনেক আগেই বুঝেছিল গেরুয়া শিবির। সে কারণে এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘বিজেপি যখন বুঝতে পেরেছে যে বাংলা শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই চায়, তখন তারা ধর্মীয় আবেগ এবং টাকা ব্যবহার করে ভোট কেনার ষড়যন্ত্র করেছে। এই ষড়যন্ত্র আজ ফাঁস হয়ে গিয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার পাল্টা বলেন, ‘ভিডিয়ো নিয়ে প্রশ্নের জবাব হুমায়ুন কবীর দেবে। তৃণমূল অনেক কিছু করতে পারে। তৃণমূল–ই হয়তো পয়সা দিয়ে হুমায়ুনকে দিয়ে এ সব কথা বলিয়েছে।’ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর কথায়, ‘উনি যখন বলেছেন তখন হয়তো সত্য। ভোটের আগে হাওয়া তৈরির নানা চেষ্টা হয়। আমাকে হারানোর জন্য অশান্তি করানো হয়েছিল হুমায়ুনের কথায়, তা জানাজানি হয়েছিল। এটাও জানাজানি হলো। ধর্মের কল বাতাসে নড়ছে।’ এই প্রসঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘উনি তৃণমূল করেছেন, কংগ্রেস করেছেন, বিজেপি করেছেন, ফের তৃণমূল করেছেন, এখন একটা পার্টি তৈরি করেছেন। এই ধরণের লোকের কোনও নীতি আদর্শ নেই। এরা টাকার খেলার অংশীদার হবে তা অপ্রত্যাশিত নয়।’