পয়লা বৈশাখ। তিনি বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো একশো চার বছর। মোটামুটি সিকি-ভাগ বাদ দিলে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রায় গোটা বিংশ শতক তিনি ছিলেন, প্রবল ভাবে ছিলেন। সেই থাকাটা, ‘লেস ভায়োলেন্ট, মোর লিরিক্যাল’। ওই ইংরেজি এক্সপ্রেশনটা আর এক সরোদশিল্পী বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের। আজকের চারপাশটা যখন সারাক্ষণ উত্তেজিত থাকার, আগ্রাসী হয়ে থাকার, তখন আলি আকবরের সরোদ নিজেরই মধ্যে একা।
একা হওয়ারই সাধনা করেছেন তিনি, সারা জীবন। সেই সাধনাতেই পৌঁছতে চেয়েছেন নীরবের মর্মতলে। এমনকী তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতেও যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে কেবল সঙ্গীতই যথেষ্ট, দাপুটে স্টেজ পারফরম্যান্সের প্রয়োজন নেই, বিশ্বাস করে গিয়েছেন আজীবন। একান্ত এক সাক্ষাৎকারে অতনু চক্রবর্তীকে একবার বলেছিলেন, চারপাশে চারিদিকে যে বিশৃঙ্খলা-শব্দ-ভিড়, সেই সঙ্গে কোনও কোনও মানুষের আচার-আচরণ, ধান্দাবাজি এ সব মনকে বড় চঞ্চল করে দেয়। এই অস্থিরতা কাটাবার জন্য পুজোর ঘরে বসে মনঃসংযোগটা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি। বেশিক্ষণ ভিড় সহ্য হয় না-তখন একটু একা থাকতে হয়।
সেই প্রথম দিনের বাজনা সম্পর্কে আলি আকবর নিজে খুব একটা স্মৃতিচারণ করেননি। কেবল বলেছিলেন, ‘সে অনেক কাল আগের কথা, তাই আমার বিশেষ কিছু মনে নেই। সেই দিনগুলিতে, সমস্ত বিশিষ্ট গায়ক এবং যন্ত্রশিল্পীরা সঙ্গীত শুনতে সামনের সারিতে বসতেন। তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে এবং মামুলি কিছু সহ্য করতেন না। তাঁদের মধ্যে কেউ-কেউ মঞ্চে এসে চিৎকার করতেন, যদি তাঁদের বাজনা ভালো না লাগত। কিন্তু আমার মনে আছে যে আমার পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর, তাঁদের অনেকেই মঞ্চে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।’
সঙ্গীতে পারফরম্যান্স শব্দটার মানে যে উচ্চতায় বেঁধেছিলেন আলি আকবর তা ছিল বহমান এক সাধনা। এ-ই তাঁকে আজীবন মঞ্চের যাবতীয় কৃত্রিমতা এবং সস্তা হাততালির মোহ থেকে দূরে রেখেছিল। এ বড় সহজ কথা ছিল না। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত রাজদরবার থেকে বেরিয়ে যখন আমজনতার টিকিট-কাটা আসরে ঢুকছে তখন শ্রোতাদের মন জয় করতে দ্রুত লয়ের ঝালা, মঞ্চে নানা কসরতের ‘শোম্যানশিপ’-এর আশ্রয় নিতে হয়েছে অনেককেই। কিন্তু আলি আকবর ছিলেন অন্য এক মেরুতে। বলতেন, ‘বাদ্যযন্ত্র থেকে সুর ওঠে। হাতের দক্ষতায় সুর তোলা যায়, কিন্তু বাজনাটা আসে ফিলিংস থেকে।’
রাগের সেই মূর্তিটারই সন্ধানে চোখ বুজে ডুব দিতেন আলি আকবর, মঞ্চে। সে ছবি আজ লুপ্তপ্রায়। শতবর্ষ পেরিয়েছেন আলি আকবর। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতও আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবু আজও তিনি এত ঢেউ তোলেন, শূন্যের ভিতরে!