সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার
চিতাবাঘের আক্রমণে দেড় বছরে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। নাগরাকাটার বামনডাঙা ও খুটাবাড়িতে তিন জন, বানারহাটের আপার কলাবাড়িতে দু'জন। সকলেই নাবালক। বনদপ্তর নিয়ম মতো ক্ষতিপূরণও দিয়েছে। অভিযোগ, নেতা, মন্ত্রী তো দূরের কথা, সে ভাবে কেউ মৃত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়াননি। এ বার অবশ্য উল্টোচিত্র। চিতাবাঘের হানায় জখম এক কিশোরের পাশে দাঁড়াতে কার্যত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে দুই ফুলের।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার রাতে। জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা ব্লকের বামনডাঙা চা-বাগানে চিতাবাঘের হামলায় গুরুতর আহত হয় সোনম ওরাওঁ নামে এক কিশোর। বামনডাঙা চা বাগানের ডায়না লাইনে থাকা আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ে উপলক্ষে এসেছিল সে। অনুষ্ঠান শেষে খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়ে পড়শির বাড়িতে। রাত দশটা নাগাদ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে কাছাকাছি চা-বাগানে ঢুকে পড়ে সে। সেই সময়ে পিছন থেকে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি চিতাবাঘ। নিজেকে কোনও ভাবে ছাড়িয়ে ছুটে প্রাণ বাঁচায় সে। পিঠে ও শরীরের একাধিক জায়গা জখম হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় আত্মীয়রা। মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে প্রতিবেশীদের চেষ্টায় ছয় কিলোমিটার দূরে শুলকাপাড়া প্রাথমিক হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। প্রচার সেরে তখন বাড়ি ফিরছিলেন মালবাজারের তৃণমূল প্রার্থী সঞ্জয় কুজুর। তিনি ১৬ বছরের ওই কিশোরকে ১৫ কিলোমিটার দূরে মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তার পাশে থাকারও আশ্বাস দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে এই খবর পেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিজেপি নেতারা। বিজেপির নাগরাকাটার বিদায়ী বিধায়ক পুনা ভেংরার আগে থেকেই প্রচার কর্মসূচি ঠিক করা ছিল। কী হবে তা হলে? অগত্যা প্রচার করতে করতেই মোবাইলে জখম কিশোরের খোঁজ নিতে শুরু করেন তিনি। ওই কিশোরের জামাইবাবু সেবক মানকি মুন্ডার কাছে দলের এক কর্মীকে পাঠিয়ে চিকিৎসার জন্য যা যা দরকার সব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সন্ধ্যার পরে সরাসরি পৌঁছে যান হাসপাতালে। কথা বলেন জখম কিশোরের পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে। পুনা বলেন, 'হাতি-চিতাবাঘের উপরে রাজ্য সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ জঙ্গলে বনকর্মী নেই। সব চাকরি তৃণমূল খেয়ে বসে আছে।' সঞ্জয় অবশ্য নির্বিকার থেকেছেন। তিনি বলেছেন, 'এটাই বিজেপির সমস্যা। যেখানে রাজনীতি করার বিষয় নয়। সেখানেও ওরা রাজনীতি করবে।'
মালবাজার হাসপাতালের বাইরে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বসে রয়েছেন কিশোরের আত্মীয় সেবক মানকি মুন্ডা। সঙ্গে রয়েছেন তাঁর বন্ধু সোমরা মুন্ডা। এ দিন তৃণমূল, বিজেপির নেতা-কর্মীদের হাসপাতালে ঘন ঘন আসা-যাওয়া দেখে অবাক হয়েছেন দু'জনে। গল্পের ছলে সেবক তাঁর বন্ধুকে বলেন, 'গত বছর পুজোর সময়ে ভোট থাকলে কত সুবিধা হতো। রাজনৈতিক তৎপরতা সেই সময়ে এতটা লক্ষ্য করা যায়নি।' বিজেপি নেতা মনোজ ভুজেল বলেন, 'আমরা বৃহস্পতিবার দিনভর খবর রেখেছি। রাতে প্রার্থী নিজেও হাসপাতালে গিয়ে দেখা করেছেন।' বন দপ্তরের এক আধিকারিক অবশ্য বলেন, 'চিতাবাঘ গ্রামে ঢোকার ঘটনার সঙ্গে এটিকে মেলালে চলবে না ওই কিশোর নিজেই অন্ধকারে ঝোপের ভিতরে গিয়েছিল, সেই এলাকা এমনিতেই চিতাবাঘের স্বাভাবিক বাসস্থান।'
সোনমের আত্মীয়রা এই বিষয়ে কিছু বলতে চান না। এক জনের মন্তব্য, 'আপনারা তো সবই দেখছেন। বুঝছেন। আমরা কিছু বললে পরে অন্য চাপ আসতে পারে।'