সরকার গড়ার ছ'মাসের মধ্যেই বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) কার্যকর করা হবে। ইস্তাহারে এমনই ঘোষণা করল বিজেপি। শুক্রবার নিউ টাউনে বিজেপির সংকল্পপত্র প্রকাশের মঞ্চে এই ঘোষণাই করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শাহ জানান, উত্তরাখণ্ড, গুজরাতের মতো বাংলাতেও ইউসিসি কার্যকর হবে।
এই বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও কোনও বিবৃতি দেয়নি। তবে বাংলার শাসকদল অতীতে একাধিক বার নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। তৃণমূল জানিয়েছিল, জাতীয় স্তরে বা সংসদে এই বিধি সংক্রান্ত বিল পেশ হলে তারা বিরোধিতা করবে।
বিজেপি তথা গেরুয়া শিবিরের দীর্ঘ দিনের দাবি, দেশে ইউসিসি চালু করা। যাতে মুসলিমদের অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়। ইতিমধ্যেই কিছু বিজেপি শাসিত রাজ্যে ইউসিসি চালু হয়েছে। এই বিধির সপক্ষে বেশ কয়েক বার সরব হয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। বছর দু'য়েক আগে স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে ইউসিসি-র পক্ষে কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, বর্তমান দেওয়ানি বিধি সাম্প্রদায়িক। এ দেশে বৈষম্যমূলক আইনের কোনও স্থান নেই। সেই দিন তিনি সব ধর্মের মানুষের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ দেওয়ানি বিধির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। গত বছর সংসদে দাঁড়িয়েও ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
কিন্তু এই আইনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা শিবিরেই প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক মহলের মত, ইউসিসি চালু হলে দেশের সব ধর্মের মানুষ একই রকম পারিবারিক, বিবাহ ও উত্তরাধিকার আইন মানতে বাধ্য থাকবেন। এই আইন যেমন মুসলিমদের জীবনে তো বটেই, জনজাতিদের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জনজাতিদের বিবাহ, উত্তরাধিকার সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক প্রথা রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু রীতি থেকে আলাদা। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে সেই সাংস্কৃতিক প্রথার কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের দাবি, ইউসিসি চালু হলে তা কোনও সংখ্যালঘু বা জনজাতি সমাজের ‘সংস্কৃতি’-কে কোনও ভাবেই প্রভাবিত করবে না। ওই আইনের আওতায় তিনটি বিষয়কে নিয়ে আসার কথা ভাবা হয়েছে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার। পদ্মশিবিরের যুক্তি, বিবাহের ক্ষেত্রে যেমন বহুবিবাহ বন্ধ করা, মেয়েদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স বেঁধে দেওয়া, আইনি বিচ্ছেদের পরেই পরবর্তী বিবাহ করাকে নিশ্চিত করবে ওই আইন। তেমনি বিচ্ছেদের বিষয়টি যাতে একমাত্র আদালতের হস্তক্ষেপেই নিষ্পত্তি হয়, সেটাই নিশ্চিত করার কথা ভাবা হয়েছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের উভয়ের সমান দাবি প্রতিষ্ঠিত করাই ওই বিধির লক্ষ্য।
যদিও বিরোধীদের দাবি, ভোট এলেই ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করে থাকেন বিজেপি নেতারা। তাঁদের লক্ষ্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ! বিরোধীদের যুক্তি, ইউসিসি নিয়ে কথা হলেই মুসলিম সংগঠন তাদের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে আপত্তি তুলবে। তাতে মেরুকরণের রাজনীতিই প্রধান হয়ে উঠবে। গত লোকসভা ভোটে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ইউসিসি-র উল্লেখ করে হিন্দু ভোটকে দলের বাক্সে টানার কৌশল নিয়েছিলেন বিজেপি নেতারা।
চলতি বছরের মার্চে সুপ্রিম কোর্টও মৌখিক ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে সায় দিয়েছিল। মুসলিম মহিলাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মামলায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল, শরিয়তি আইন বাতিল করা হলে আইনি শূন্যতার সৃষ্টি হবে। তার বদলে সংসদে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছিলেন, 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধিই সমাধান।' ঘটনাচক্রে, শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পরেই পশ্চিমবঙ্গেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর কথা বলল বিজেপি।