বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, বাগনান: কী ছুটছে রে বাবা! হাঁপিয়ে যাচ্ছি তো! ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টা পেরিয়ে গিয়েছে। চড়া রোদ। বাগনান ২ নম্বর ব্লকের মুগকল্যাণ বেনাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বেনাপুর গ্রামের মোড়ে এসে বেলুনে সাজানো টোটো বড়ো রাস্তায় রেখে গ্রামের সরু রাস্তা ধরলেন অরুণাভ সেন। বিধায়ক হিসাবে এলাকায় তিনি ‘রাজা’ নামেই পরিচিত। যে পথে পা বাড়ালেন, সেই গ্রামে প্রচুর মানুষের বাস, এমনটা নয়। পুকুর, মাঠ, বন-বাদাড়ের আনাচকানাচ থেকে যে ক’টা মানুষের অবয়ব ভেসে উঠল, হাত জড়ো করে নমস্কার করলেন রাজা। প্রতি নমস্কার ফিরিয়ে দিতে গিয়ে ভোটার টের পেলেন, প্রার্থী ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে পড়িমড়ি করে ছুটছেন দলের কর্মী-সমর্থকরা। কিন্তু ছুটলেও যেন তাল রাখতে পারছিলেন না তাঁরা। এক কিলোমিটারের বেশি রাস্তা ঘুরে রাজা যখন ফের বড়ো রাস্তায় উঠলেন, বাকিরা ভাবলেন, ফুরসত মিলল হয়তো। কিন্তু কোথায় কী! ‘ওদিকটায় ঘুরে আসি’ বলে ফের উলটোদিকের সরু পথ ধরলেন তিনি। এদিকে জোড়াফুলের ছাপওয়ালা ঘিয়ে রঙের শাড়ি পরে দুই বয়স্কা মহিলা ততক্ষণে রীতিমতো ঘামছেন। রাস্তা থেকেই জল কিনে খেতে খেতে খেদ নিয়ে বললেন, এত জোরে কি হাঁটা যায়?
বাগনানে তৃণমূল এবারও প্রার্থী করেছে অরুণাভ ওরফে রাজা সেনকে। এলাকার দাবাং নেতা হিসাবে খ্যাত রাজার প্রশংসা করছিলেন খালোড়ের বাসিন্দা মানিকলাল বসু। বললেন, এলাকায় এই ক’বছরে কিছু ভালো কাজ যে হয়েছে, তা অস্বীকার করি কী করে? রাস্তাঘাট, আলো, জলের পাশাপাশি বিধায়ক কয়েকটি খাল সংস্কার করেছেন নিজের উদ্যোগে। যে সংস্কারের কাজ ১০০ দিনের টাকায় হওয়ার কথা ছিল, তা হয়েছে বিধায়কের উদ্যোগে। তা এলাকায় চাষাবাদে অনেকটা সুবিধা করে দিয়েছে। এমনকি, পড়শি বিধানসভা এলাকার দুঃস্থ পরিবারের মেধাবী পড়ুয়াদের পাশে থেকে উচ্চশিক্ষার দায়িত্বও যে তিনি নিয়েছেন, সেই খবরও শোনালেন এলাকার বাসিন্দারা। নুন্টিয়ার এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়, রাজা রোজ সকালে হাঁটতে বের হন। প্রায় ১০ কিলোমিটারের মর্নিংওয়াকে জনসংযোগ হয়ে যায়। অভাব-অভিযাগ শোনেন। সাধ্যমতো সমাধানের চেষ্টা করেন। গ্রামে ঘুরে নিয়ম করে এই জনসংযোগ তাঁকে অনেকটা মাইলেজ দেয়। এবারও দেবে। তবে তাঁর আমলে এলাকায় একাধিক দুর্নীতিও যে হয়েছে, তাও স্বীকার করছেন এলাকাবাসী।
ভোটের বাদ্যি বাজার পর একবার মাইক ফুঁকে জনতার দরবারে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন রাজা সেন। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে বলেছিলেন, দিদি, ক্ষমা করবেন। যারা উস্কানি দেবে, তাদের ছেড়ে কথা বলব না। উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে এসে বাঙালি সেন্টিমেন্টকে আঘাত করবে আর উস্কানি দেবে, এসব মেনে নেওয়া যায় না। সেই ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। তবে কি হিংসা আর হুমকির রাজনীতি দিয়েই এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে? বিজেপি এবার এখানে টিকিট দিয়েছে প্রেমাংশু রানাকে। তাঁর কথায়, ওসব শাসানি, হুমকি কাজে লাগবে না। ভোটবাজারে ওসব ধমক-চমকে কাজ হবে না। তৃণমূল আদ্যপান্ত দুর্নীতিবাজ। সরকারি তো বটেই, বেসরকারি জায়গাতেও দুর্নীতি পৌঁছে দিয়েছে তৃণমূল। মানুষ সব দেখছেন। ভোটাররা তার যোগ্য জবাব দেবেন ভোটের দিন।
বাগনান স্টেশন লাগোয়া জমজমাট বাজার এলাকায় ভোটের ছাপ তেমন নেই। থানার দিকে এগতে প্রথম যে দেওয়াল লিখন চোখে পড়ল, তা বিজেপির। তাহলে কি প্রচারে এগিয়ে পদ্মফুল? ভুল ভাঙতে অবশ্য বেশি সময় লাগল না। স্টেশনের দু’দিকে মূল রাস্তায় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার গিয়ে বোঝা গেল, দেওয়ালে পদ্ম আঁকা আর সেভাবে হয়ে ওঠেনি বিজেপির। তাদের অস্তিত্ব অতি ক্ষীণ। হাল্যান গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসুদেবপুরের এক বাসিন্দার কথায়, এই এলাকায় বিজেপির গ্রামীণ জেলা সভাপতির বাস। কিন্তু দেওয়ালে দেওয়ালে তো রাজা-ই হাজির। পদ্ম-প্রার্থীর নাম দেখতে পাচ্ছেন? বরং সিপিএম প্রার্থী ভাস্কর রায় দেওয়াল দখল করে এলাকাকে দুর্নীতিমুক্ত করার, মা-বোনদের ইজ্জত বজায় রাখার, চাকরির বাজার গরম রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। স্থানীয় এক বিজেপি কর্মীর ফুটনোট, মানুষ ঠিক করে ফেলেছেন আমাদের ভোট দিয়ে এলাকা পাপমুক্ত করবেন। গা জোয়ারি করে দেওয়াল লিখে সুবিধা করতে পারবে না তৃণমূল। মিরাকল হবে, দেখে নেবেন এবার!