• মানুষের স্বার্থে এবার সুন্দরবনকে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
    বর্তমান | ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • শ্যামলেন্দু গোস্বামী, হাড়োয়া: উন্নয়ন, সুন্দরবন ও রাজনৈতিক বার্তার ত্রিমুখী সুরেই হাড়োয়ায় ভোটের প্রচার সারলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবারের নির্বাচনি সভা থেকে তিনি যেমন সুন্দরবনকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টার প্ল্যান’এর ঘোষণা করলেন, তেমনই স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ‘ভবিষ্যত’ নিয়েও সতর্ক করেছেন। তাঁর কথায়—বিজেপি এলে, ভেড়িতে মাছ চাষ  করতে দেবে না।  

    হাড়োয়ার সার্কাস মাঠে এদিন মিনাখাঁর তৃণমূল প্রার্থী ঊষারাণী মণ্ডল ও হাড়োয়ার প্রার্থী আব্দুল মাতিনের সমর্থনে নির্বাচনি সভা হয়। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে কাতারে কাতারে মানুষ উপস্থিত হন সভাস্থলে। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমেই বাংলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, বাংলা নদীমাতৃক। আর সুন্দরবন সেই পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অসংখ্য নদী, খাঁড়ি, জঙ্গল ও জলাভূমি ঘেরা এই অঞ্চলে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচতে হয় মানুষকে। বাঘ, কুমিরের মতো বিপদের মাঝেও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই দিন কাটান সুন্দরবনের বাসিন্দারা। সেই বাস্তবতার কথাই তুলে ধরে তিনি জানান, এই অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার একটি সুসংহত মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করতে চলেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে পরিবেশ রক্ষার প্রসঙ্গও। তিনি দাবি করেন, ইতিমধ্যেই সুন্দরবনে প্রায় পাঁচ কোটি ম্যানগ্রোভ গাছ বসানো হয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমায়। প্রকৃতিকে বাঁচাতে পারলে মানুষও বাঁচবে—এই বার্তাই সভামঞ্চ থেকে বারবার তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, উন্নয়ন ও পরিবেশ—এই দুইকে সমান গুরুত্ব দিয়েই এগচ্ছে রাজ্য সরকার। 

    সুন্দরবনের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি মাছ চাষ নিয়েও সরব হন তৃণমূল সুপ্রিমো। ভেড়ি বা জলাশয় নির্ভর মাছ চাষ বহু পরিবারের প্রধান জীবিকা। আর এই বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বিজেপিকে কটাক্ষ করেন। মমতার কথায়, বিজেপিকে ভোট দিলে আপনারা এলাকার ভেড়িতে মাছ চাষ করতে পারবেন না। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ওদের মতো করে খেতে হবে। মাছ, মাংস বা ডিম খেতে দেবে না ওরা। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ মানুষ, বার্তা বাংলার ‘পাহারাদার’এর! মাছ চাষের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও সরকারের একাধিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। ধান উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের সহায়তা, গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নয়ন—সবক্ষেত্রেই রাজ্যের কাজের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার একটাই লক্ষ্য—মানুষের উন্নয়ন। তাঁর দাবি, রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য বিশেষ প্রকল্পের কথাও শোনান তিনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মমতা। ভবিষ্যতে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দেন তিনি। যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও চাঙা করতে পারে। সবমিলিয়ে হাড়োয়ার এই জনসভা শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উন্নয়ন বনাম আশঙ্কার দ্বন্দ্ব, পরিবেশ রক্ষার বার্তা এবং স্থানীয় জীবিকার প্রশ্ন—এই তিনকেই সামনে এনে ভোটারদের কাছে পৌঁছতে চেয়েছে তৃণমূল। সুন্দরবনের জন্য ঘোষিত মাস্টার প্ল্যান যে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে, এ দিনের বক্তব্যে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • Link to this news (বর্তমান)