• ক্ষমতায় এলে দ্বিগুণ ভাতার শাহি–আশ্বাস
    এই সময় | ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: ভাতার জবাব ভাতা দিয়েই!

    বিজেপির নির্বাচনী সংকল্পপত্রে শিল্প, কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও সেখানে নজর কেড়েছে মূলত বাংলার মহিলা–যুবকদের ভাতা দ্বিগুণ করার আশ্বাস। বাং‍লায় ডাবল ইঞ্জিন সরকার তৈরি হলে মহিলা ও যুবদের ভাতাও ডাবল হবে বলে শুক্রবার ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বর্তমা‍নে বাংলার তৃণমূল সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে মহিলাদের মাসে দেড় হাজার টাকা করে দেয়। বিজেপি এ বার ক্ষমতায় এলে সেই টাকা বেড়ে তিন হাজার হবে বলে সংকল্পপত্রে উল্লেখ করেছে তারা।

    শুক্রবার নিউ টাউনের একটি হোটেলে সেই সংকল্পপত্র আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করে শাহের দাবি, ‘বাংলায় বিজেপির সরকার তৈরি হওয়ার পরে প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে তিন হাজার টাকা রাজ্যের সব মহিলার অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে।’ সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম পে কমিশন চালু এবং কেন্দ্রীয় হারে তাঁদের মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে বিজেপির এই ইস্তেহারে। শুধু মহিলাদের নয়, ভাতাকে সম্বল করে বাংলার যুব সমাজের মন ছোঁয়ারও চেষ্টা করছে গেরুয়া ব্রিগেড। গত ফেব্রুয়ারিতে রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বেকার যুবকদের মাসিক দেড় হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। ভোটের আগেই সেই টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রেও দ্বিগুণ ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। তাদের নির্বাচনী সংকল্পপত্রে বেকার যুবকদের মাসে তিন হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিন শাহ বলেন, ‘বিজেপির সরকার তৈরি হওয়ার পরে বাং‍লায় নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করব। স্টার্টআপের ক্ষেত্র তৈরি করব। ক্ষুদ্র শিল্পকে উৎসাহ দেবো। সেই সঙ্গে বেকার যুবকদের মাসিক তিন হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও বিজেপি দিচ্ছে।’ বাংলার কৃষকদেরও অনুদান বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে বিজেপির সংকল্পপত্রে। সেখানে বলা হয়েছে, কেন্দ্রের ছ’হাজার টাকার সঙ্গে বাংলার বিজেপি সরকার আরও তিন হাজার টাকা যোগ করে মোট ন’হাজার টাকা করে দেবে কৃষকদের।

    ২০২৪–এর লোকসভা ভোটে বাংলার মহিলা ভোটারদের বড় অংশই তৃণমূলকে সমর্থন জানিয়েছিল, যা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এফেক্ট’ বলে বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্বের পর্যবেক্ষণ। ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক ভাবে এর মোকাবিলা বিজেপি কী ভাবে করবে, তা নিয়ে বেশ কিছু মাস ধরেই চর্চা চলছিল গেরুয়া শিবিরের অন্দরে। দলের একাংশের যুক্তি ছি‍ল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্পগুলিতে বাংলার মহিলারা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। ফলে বিধানসভা ভোটের আগে মহিলা ভোটারদের খুশি করতে এমন একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যার কাছে মমতার মহিলাদরদী ভাবমূর্তিও ম্লান হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির সেই মনোভাবের কিছুটা প্রতিফলন দেখা গিয়েছে তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে।

    শুধু প্রতি মাসে মহিলাদের তিন হাজার টাকা করে দেওয়াই নয়, সেই সঙ্গে মহিলাদের জন্য আরও নানারকম সুযোগ–সুবিধার প্রতিশ্রুতিও রাখা হয়েছে সংকল্পপত্রে। শাহের কথায়, ‘মহিলাদের তিন হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি সমস্ত রাজ্য সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বিজেপির সরকার করবে। ৭৫ লক্ষ লাখপতি দিদি তৈরি করে বাং‍লার বিজেপি সরকার মহিলাদের আত্মনির্ভরশীল করবে।’ তাঁর সংযোজন, ‘এ রাজ্যে বিজেপির সরকার তৈরি হওয়ার পরে প্রত্যেক মণ্ডলে অন্তত একটি মহিলা থানা এবং প্রত্যেক পুলিশ থানায় একটি করে মহিলা ডেস্ক তৈরি হবে।’ এরপরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না–করে শাহের কটাক্ষ, ‘বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীকে আর বলতে হবে না, এত রাতে মহিলাদের বাইরে বেরনোর কী দরকার!’ রাজ্যের সব সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করার আশ্বাসও রয়েছে বিজেপির নির্বাচনী সংকল্পপত্রে। তৃণমূল জমানার বিভি‍ন্ন সময়ে মহিলাদের উপরে ঘটা অত্যাচারের ঘটনাগুলির কথা স্মরণ করিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ দিন বলে‍‍ন, ‘রাজ্যের মহিলাদের উপরে নির্যাতনের ঘটনাগুলি নিয়ে তদন্ত কমিশন বসানো হবে কোনও অবসরপ্রাপ্ত মহি‍লা বিচারপতির নেতৃত্বে।’

    অবশ্য শুধু অনুদান আর ‘পাইয়ে দেওয়ার’ রাজনীতি নয়, বাংলায় বিজেপির সরকার তৈরি হলে যে অর্থনৈতিক বিকাশের উপরেও জোর দেওয়া হবে, সেটাও এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন শাহ। তবে অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে অনুদান বা ভাতার যে কোনও বিরোধ নেই, তাও দাবি করেছেন শাহ। যদিও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এতদিন মমতার সরকারের ভাতা–রাজনীতির সমালোচনা করে এসেছে বিজেপি। তা হলে নির্বাচনী সংকল্পপত্রে পাল্টা ভাতার পথেই কেন হাঁটল বিজেপি? এর জবাবে শাহ বলেন, ‘তৃণমূল সরকার বাংলার মানুষকে খাদে ফেলেছে। সেই খাদ থেকে মানুষকে তোলার জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। নিজের পায়ে একবার দাঁড়িয়ে গেলে তাঁরা নিজের পথ নিজেরাই খুঁজে নেবেন।’

    বঙ্গবাসীকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতেও একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির। যেম‍ন, সিঙ্গুরে একটি শিল্প পার্ক তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বিজেপির সংকল্পপত্রে। পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরিয়ে আনতে এবং শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্য আগামী পাঁচ বছরে সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির আশ্বাসও রয়েছে ওই সংকল্পপত্রে। শাহের ঘোষণা, ‘তাজপুর এবং কুলপিতে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করে বাংলায় সামুদ্রিক বাণিজ্যের সমস্ত সম্ভাবনাকে আমরা সম্পূর্ণ ভাবে কাজে লাগাব।’

  • Link to this news (এই সময়)