এই সময়: ভোটের আগেই ভাঙল জোট! হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হাত ছাড়ল আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিম।
কিন্তু এখানেও শেষ হয়ে হইল না শেষ! বিধানসভা ভোটের মুখে হুমায়ুন কবীরের ভাইরাল ভিডিয়ো (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) যে তৃণমূলের শক্তিশালী অস্ত্র হবে, সেটা বিলক্ষণ জানেন বিজেপি নেতৃত্ব। তৃণমূল ওই ভাইরাল ভিডিয়ো দেখিয়ে হুমায়ুন–বিজেপি আঁতাঁতের ন্যারেটিভ প্রচার করবে— সেই আশঙ্কাও তাঁদের ছিল। তাই এই ইস্যুতে কাউন্টার ন্যারেটিভের মুখবন্ধ কেমন হবে, তা স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহই বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্বকে। শুক্রবার হুমায়ুন ইস্যুতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে শাহের স্পষ্ট জবাব, ‘আমরা ২০ বছর বিরোধী আসনে বসে থাকব, তবু বাবরি মসজিদ তৈরি করতে চাওয়া দলের সঙ্গে হাত মেলাব না।’ তাঁর দাবি, ভাইরাল ভিডিয়োটি ভুয়ো। এবং তার পিছনে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত আছে বলেও শাহের ইঙ্গিত। যদিও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘হুমায়ুন যে বিজেপির বি টিম, সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।’ আর বারাসতে নির্বাচনী সভা থেকে এ দিন সরাসরি হুমায়ুনের নাম না করে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘দেখছেন তো কত টাকার খেলা হচ্ছে। কত কী দেখা যাচ্ছে!’
এ দিন সকালে হুমায়ুনের জোটসঙ্গী মিম–এর তরফে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির (হুমায়ুনের দল) সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তারা। মিম–এর বক্তব্য, মুসলিমদের সততা ও অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, এমন কোনও দলের সঙ্গে তাদের জোট থাকতে পারে না। এর ফল বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদা, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলিতে কী ভাবে পড়ে, সে দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।বৃহস্পতিবার রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়। যেখানে দেখা এবং শোনা যায়, মুর্শিদাবাদে ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণকে সামনে রেখে হুমায়ুন কবীর বিজেপির সঙ্গে এক হাজার কোটি টাকার ডিল করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। সেই ডিল অনুযায়ী বিজেপি যদি রাজ্যে সরকার গড়তে পারে, তা হলে ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য দর কষাকষিও করতে শোনা গিয়েছে ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ককে। এই ভিডিয়োর সত্যতা ‘এই সময়’ যাচাই না করলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ১৯ মিনিটের ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই নড়েচড়ে বসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বৃহস্পতিবার রাতেই দাবি করেছিলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে ভিডিয়োটি তৈরি হয়েছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। এ দিন হুমায়ুনও উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে দাবি করেন, ভিডিয়োটি এআই দিয়ে বানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এক্স হ্যান্ডলে ওয়েইসি সাহেবের দল পোস্ট করে জোটে থাকবে না বলে জানিয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁদের আছে।’ তাঁর দাবি, ওয়েইসি ভালো মানুষ। তবে তাঁর দলের রাজ্য সভাপতি ওয়েইসিকে ভুল বুঝিয়েছেন। হুমায়ুনের স্পষ্ট কথা, ‘এ সব করে আমাকে রোখা যাবে না। মিম সরে গেলেও আমি কোনও ভাবে দুর্বল হব না।’
শুভেন্দু এবং হুমায়ুনের এআই তত্ত্বকে খোঁচা দিয়ে এ দিন তৃণমূল ভবনের সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক বলেন, ‘এটা খুবই আশ্চর্যের। হুমায়ুনও বলছেন, ভিডিয়োটি এআই দিয়ে তৈরি হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীও তাই বলছেন। আমি আর কী বলব! ঠাকুর ঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি জানি না, এটা কী ভিডিয়ো। তবে ওঁর দল ছেড়ে লোকজন চলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় জোটসঙ্গী মিম ছেড়ে চলে গিয়েছে। ওদের নিজের লোকই মানছে না যে, ওটা এআই দিয়ে তৈরি। আমি পুরো ভিডিয়ো দেখিনি। ভিডিয়োতে হুমায়ুন বলছে, ফেসটাইমে শুভেন্দুর সঙ্গে কথা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, পিএমও-র সঙ্গে কথা হয়েছে।’ যদিও হুমায়ুনের পাল্টা বক্তব্য, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ববি হাকিমদের আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আমি কার সঙ্গে কথা বলছি, তাঁকে সামনে আনা হোক।’
প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা বহরমপুরের কংগ্রেস প্রার্থী অধীর চৌধুরীর কথায়, ‘মুসলিম ভোট এক জায়গায় নিয়ে আসার জন্য দু’টো পার্টি (ওয়েইসি ও হুমায়ুনের দল) ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এ ছাড়া আর তো কোনও মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না। তারপরে ভিডিয়ো ভাইরাল এবং জোট ছাড়াছাড়ি। কোথাকার ভিডিয়ো, কীসের ভিডিয়ো, কেন ভিডিয়ো, কী ভাবে এল— তার কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যে আমরা কিছুই জানি না। তবে এ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর তাদের এজেন্সি কী করতে পারে আর কী পারে না, তার ছোটখাটো অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে।’
এ বারের বিধানসভা ভোটে বিজেপি তীব্র মেরুকরণের পথে হাঁটছে বলে দাবি অভিযোগ জোড়াফুল নেতৃত্বের। তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ তুলে হিন্দু ভোট এককাট্টা করাই পদ্মের লক্ষ্য। এই আবহে হুমায়ুনের মতো ‘বাবরি মসজিদ’ তৈরি করতে চাওয়া নেতার সঙ্গে বিজেপির যোগসাজশের প্রচার যথেষ্ট অস্বস্তিকর গেরুয়া শিবিরের পক্ষে। এ দিন নিউ টাউনের হোটেলে সাংবাদিক বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পাল্টা তৃণমূলকে নিশানা করে বলেন, ‘মমতাজির ক্ষমতা সম্পর্কে আপনাদের কোনও ধারণা নেই। উনি এমন দু’হাজারটি ভিডিয়ো বানাতে পারেন। কিন্তু হুমায়ুন কবীর আর বিজেপি আদর্শগত ভাবে উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু। আমাদের মধ্যে কখনও বোঝাপড়া হতে পারে না। যারা পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরি করতে চায়, তাদের সঙ্গে হাত মেলানোর চেয়ে আরও ২০ বছর বিরোধী আসনে বসা আমাদের কাছে শ্রেয়।’