সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার
ঋতুপর্ণ ঘোষের 'তিতলি' ছবির পর্দায় মিঠুনের দেখা হয়েছিল তার প্রথম যৌবনের প্রেমিকার সঙ্গে। প্রেমিকা তখন বিগতযৌবনা, চা বাগান ম্যানেজারের গিন্নি। সেই চরিত্র অপূর্ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন অপর্ণা সেন। অনেকেই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েছিলেন এই দুই চরিত্রের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে।
প্রিয় মানুষ চোখের সামনে না থাকলেও তাকে খুঁজে পাওয়ার তাড়না থেকে যায় এ ভাবেই। তিনি প্রেমিকা হোন, বা অন্য কোনও প্রিয়জন। মিঠুন চক্রবর্তী খুঁজে পেলেন এমন একজন মানুষকে। তিনি গৌরাঙ্গের বাল্যকালের পড়শি দিদি। শহরে সহস্রের ভিড়ে, অযুতের মাঝখানে ছেলেবেলার দিদিকে জড়িয়ে ধরেন পর্দার মহাগুরু। সিনেমার স্ক্রিন নয়, শুক্রবার দুপুরে বাস্তবের মাটিতে এমন ঘটনার সাক্ষী থাকল শহর মালবাজার।
জোড়াবাগান পাথুরিয়াঘাটা জুড়ে একটা বিরাট বসতি এলাকা। অসংখ্য সরু গলি। ঝুপড়ির মতো বাড়ি-ঘর। সেখানেই থাকতেন গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী। সেই ছোট গলি থেকে বেলুনের মতো উড়ান দিয়েছিলেন তিনি। পৌঁছে গিয়েছিলেন বলিউডের হল অফ ফেম-এ। গৌরাঙ্গ থেকে মিঠুন হয়ে ওঠা সেই নায়কের পড়শি ছিলেন জ্যোৎস্না দাস। পুরোনো শহরের এক কিশোরী।
এর পরে সময় এগিয়েছে স্রোতের মতো। গঙ্গা ছেড়ে তিস্তার পাশে জলপাইগুড়িতে দিদির বাড়ি চলে আসেন জ্যোৎস্না। বিয়ে হয় মালবাজার শহরের ক্ষুদ্র দশকর্মা ব্যবসায়ী কালীপদ পালের সঙ্গে। সেই থেকে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা এই শহরের নেতাজি কলোনি। আর গৌরাঙ্গ হয়ে ওঠেন মিঠুন। জ্যোৎস্না যখন সংসার ঠেলতে ব্যস্ত, তখন তাঁর সে দিনের কালো রোগা ভাইটি ভেঙে ফেলেন বলিউডের সুদর্শন নায়কের ইমেজ। আর সামনাসামনি দেখা হয়নি, শুধু সিনেমার পোস্টার, টেলিভিশন আর সিনেমা হলে মিঠুন একটা মরীচিকার মতো আজীবন ঘুরে বেড়িয়েছেন জ্যোৎস্নার জগতে।
অনেক পথ ঘুরে মিঠুন এখন রাজনীতির ফেরিওয়ালা। ভাই কোন দলের নেতা, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই দিদির। শুধু যখন এই বৃদ্ধার কানে এল, মালবাজারে মিঠুন আসছেন, হুডখোলা জিপে ঘুরবেন, তখনই তিনি ছেলেদের কাছে আবদার জুড়ে দেন- মিঠুনের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। কিন্তু, রোড শো-র ভিড়ে মহাগুরুকে দেখা কী ভাবে সম্ভব। তাই শুক্রবার মালবাজার টুরিস্ট লজে ডাকা হয় বৃদ্ধাকে। সেখানে মিঠুনের আহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মাকে নিয়ে লজে আসেন জ্যোৎস্নার ছোট ছেলে জয়ন্ত পাল ও নাতি জোজো পাল।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের অপেক্ষা। কখন দেখা হয়। এই সময়টায় স্মৃতির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন জ্যোৎস্না। মালবাজারে এসে পড়েছিল পাথুরিয়াঘাটার অলিগলি। প্রবীণা বলেন, 'গৌরাঙ্গ আমার থেকে বেশ কিছুটা ছোটই ছিল। আমি থাকতাম মামাবাড়িতে। আমার মামাতো ভাই বাবলু আইচ। ও ছিল গৌরাঙ্গর বন্ধু। আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসত।' সেই সময়ে কত আড্ডা, ভাল-লাগার মুহূর্ত। জ্যোৎস্না বলেন, 'সরস্বতী পূজোয় আমরা খুব আনন্দ করতাম। এই পুজোর সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল গৌরাঙ্গর নাচ। উফ, রোগা ছেলেটা কী দারুণ নাচতো।'
এ সব কথা ভাবতে-বলতে অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। প্রতীক্ষাও অধীর হয়ে উঠছিল। খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে আসেন মিঠুন। 'ডিস্কো কিং'-এর এখন ট্রেডমার্ক চেহারা। মহাগুরু মিঠুনকে দেখে কিছুটা বিহ্বল হয়ে যান জ্যোৎস্না। এ কি সেই গোরা। কোনও কথা বেরোয় না মুখ থেকে। বিজেপি কর্মীরা চিনিয়ে দেন বৃদ্ধাকে। নায়ক কাছে টেনে নেন হারিয়ে-ফেলা দিদিকে। বলেন, 'কত দিন পরে তোমাকে দেখলাম।' চওড়া কালো চশমার আড়ালে থেকে যায় রাজনীতিক মিঠুনের আবেগ, ভালোবাসা। মাঝে ছ'টা দশক পড়ে আছে। তার পরে দেখা। শাড়ির সাদা আঁচলের খুট দিয়ে চোখের জল মুছে নেন জ্যোৎস্না। গৌরাঙ্গর জন্য এসেছিলেন তিনি। দেখা হয়ে গিয়েছে মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে।