সরকার গড়ার ছ'মাসের মধ্যেই বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) কার্যকর করা হবে বলে শুক্রবার বিজেপির সংকল্পপত্র (ইস্তেহার) প্রকাশের মঞ্চে ঘোষণা করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এ বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বাংলায় এসে ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করলেন। বললেন, 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করে তোষণ শেষ করা হবে।' অতীতে জাতীয় স্তরে একাধিক বার ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে মোদীকে। তবে সম্ভবত প্রথম বার বাংলায় এই বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন তিনি।
ঘটনাচক্রে, যে জায়গায় গিয়ে ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করেছেন মোদী, মুর্শিদাবাদের সেই জঙ্গিপুর সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে মোদীর মুখে রাজ্যে ইউসিসি কার্যকরের ঘোষণা রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। ইউসিসি-র পাশাপাশি, জঙ্গিপুরে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়েও বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, ‘তৃণমূল বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের ভোটে সরকার তৈরি করতে চায়। তা করতে দেওয়া যাবে না। তাই এই ভোট কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের ভোট নয়। বাংলার পরিচিতি বাঁচানোর ভোট।’ মোদীর অভিযোগ, ‘এখানে রামনবমীর মিছিলেও হামলা হয়েছে। পাথর ছোড়া হয়েছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ এর পরেই তাঁর অঙ্গীকার, ‘পশ্চিমবঙ্গে আমরা বাঙালিদের সংখ্যালঘু হতে দেব না আমরা। সকলে একজোট হয়ে ভোট দিতে যান। সরকার পরিবর্তন করুন। আপনাদের একটি ভোট আমাদের কাছে আশীর্বাদ।’
ইউসিসি নিয়ে বিজেপিকে পাল্টা জবাব দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। শনিবার ঝাড়গ্রামের সভায় তিনি বলেন, 'সংকল্পতে বলেছে, UCC করবে। আপনার কোনও অধিকার থাকবে না। আপনার ইচ্ছেমতো ধর্মচর্চা, আপনার সংস্কৃতি মানার অধিকার থাকবে না। হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসীদের আলাদা মতে বিবাহ হয়। এরা বলছে, একটাই পথ হবে। বিজেপি মন্ত্র শিখিয়ে দেবে। বিজেপি যা বলে দেবে, সেটাই করতে হবে। এটা দেশের জন্য ক্ষতিকর, মানুষের সবকিছু কেড়ে নেবে। আপনার শিক্ষা, আপনার ধর্ম, আপনার ঐতিহ্য কেড়ে নেবে।'
বিজেপি তথা গেরুয়া শিবিরের দীর্ঘ দিনের দাবি, দেশে ইউসিসি চালু করা। যাতে মুসলিমদের অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়। ইতিমধ্যেই কিছু বিজেপি শাসিত রাজ্যে ইউসিসি চালু হয়েছে। এই বিধির সপক্ষে বেশ কয়েক বার সরব হয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। বছর দু'য়েক আগে স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে ইউসিসি-র পক্ষে কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, বর্তমান দেওয়ানি বিধি সাম্প্রদায়িক। এ দেশে বৈষম্যমূলক আইনের কোনও স্থান নেই। সেই দিন তিনি সব ধর্মের মানুষের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ দেওয়ানি বিধির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। গত বছর সংসদে দাঁড়িয়েও ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
কিন্তু এই আইনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা শিবিরেই প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক মহলের মত, ইউসিসি চালু হলে দেশের সব ধর্মের মানুষ একই রকম পারিবারিক, বিবাহ ও উত্তরাধিকার আইন মানতে বাধ্য থাকবেন। এই আইন যেমন মুসলিমদের জীবনে তো বটেই, জনজাতিদের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জনজাতিদের বিবাহ, উত্তরাধিকার সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক প্রথা রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু রীতি থেকে আলাদা। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে সেই সাংস্কৃতিক প্রথার কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের দাবি, ইউসিসি চালু হলে তা কোনও সংখ্যালঘু বা জনজাতি সমাজের ‘সংস্কৃতি’-কে কোনও ভাবেই প্রভাবিত করবে না। ওই আইনের আওতায় তিনটি বিষয়কে নিয়ে আসার কথা ভাবা হয়েছে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার। পদ্মশিবিরের যুক্তি, বিবাহের ক্ষেত্রে যেমন বহুবিবাহ বন্ধ করা, মেয়েদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স বেঁধে দেওয়া, আইনি বিচ্ছেদের পরেই পরবর্তী বিবাহ করাকে নিশ্চিত করবে ওই আইন। তেমনি বিচ্ছেদের বিষয়টি যাতে একমাত্র আদালতের হস্তক্ষেপেই নিষ্পত্তি হয়, সেটাই নিশ্চিত করার কথা ভাবা হয়েছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের উভয়ের সমান দাবি প্রতিষ্ঠিত করাই ওই বিধির লক্ষ্য।
যদিও বিরোধীদের দাবি, ভোট এলেই ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করে থাকেন বিজেপি নেতারা। তাঁদের লক্ষ্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ! বিরোধীদের যুক্তি, ইউসিসি নিয়ে কথা হলেই মুসলিম সংগঠন তাদের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে আপত্তি তুলবে। তাতে মেরুকরণের রাজনীতিই প্রধান হয়ে উঠবে। গত লোকসভা ভোটে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ইউসিসি-র উল্লেখ করে হিন্দু ভোটকে দলের বাক্সে টানার কৌশল নিয়েছিলেন বিজেপি নেতারা।