দিনেদুপুরে প্রকাশ্য রাস্তাঘাটে শুটআউট কিংবা রাতের অন্ধকারে গুপ্ত ঘাতকের হামলা – এসবই ছিল রেলশহর খড়গপুরের চেনা ছবি। দেশের অন্যতম বড় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঘিরে গড়ে ওঠা কলোনিতে রেলের চাকার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল ভাগ্যের চাকাও। ওয়াগন ব্রেক করে সহজপথে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আয়ের যে অন্ধকার পথ বেছে নিয়েছিল রামবাবু, শ্রীনু নায়ডুদের মতো ‘গ্যাংস্টার’রা, তার খেসারৎ কম দিতে হয়নি তাদের। গুরুর হাতে শিষ্যের খুন হওয়ার মতো শিউরে ওঠার দৃশ্য এখনও ভুলতে পারেনি খড়গপুরবাসী।
তবে সেসব ভয়াবহ দিন আপাতত অতীত। খড়গপুরের দুষ্কৃতীরাজ অনেকটা ঠান্ডা করে দিয়েছেন এখানকার গেরুয়া শিবিরের জনপ্রতিনিধি, এমনই শোনা যায় আশপাশে কান পাতলে। বঙ্গ রাজনীতিতে তিনি ‘দাবাং’ নেতা বলে পরিচিত। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। খড়গপুর সদরের প্রাক্তন বিধায়ক দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। তিনিই নাকি এখানকার গুন্ডারাজ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ‘পাশ’ করেছেন। এবারও প্রার্থী দিলীপ ঘোষ তাই এখানকার বড় ভরসা। তবে ছাব্বিশের ভোটে (West Bengal Elections 2026) খড়গপুরে গেরুয়া হাওয়াই একমুখী, তা কিন্তু নয়। শাসকদলও ভালো লড়াই দিচ্ছে। তাদের আবার হাতিয়ার দিলীপের কুকথা। এর মাঝে দূষণ নিয়ে প্রচারে ঝড় তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে সিপিএম। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট খড়গপুর সদরের লড়াই ধুন্ধুমার।
রেলশহর হওয়ায় খড়গপুর সদরে মিশ্র জনবসতি। এখানকার মোট ভোটার ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৪৭৬। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশই তেলুগু অধ্যুষিত। খড়গপুর সদর কেন্দ্রের ভোট নিয়ন্ত্রক তাঁরাই। বলা হয়, তেলুগু ভোট যেদিকে, সেই প্রার্থীর জয় রুখতে পারবে না কেউই। মুসলিম ভোটার ১২ শতাংশ। এবার অবশ্য ভোটার সংখ্যায় কিছুটা হেরফের হয়েছে। তার কারণ, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। ১৬ হাজার ৫৮৩ জন বিচারাধীনের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার ভোটারের নামই বাদ পড়েছে।
খড়গপুর সদর বরাবর ছিল বিরোধীদের দখলে। দাপুটে জনপ্রিয় প্রয়াত জ্ঞানসিং সোহনপাল ছিলেন এখানকার অপ্রতিরোধ্য জনপ্রতিনিধি। পরপর আটবার ‘হাত’ চিহ্নের দৌলতে এই কেন্দ্র হাতে রেখেছিলেন ‘চাচা’। কিন্তু ২০১১ সালের পর যথারীতি গোটা রাজ্যের মতো খড়গপুরের রং বদল হয়। তবে সবুজ গাঢ় হওয়ার আগে অচিরেই লাল রং কেড়ে নেয় গেরুয়া। ২০১৬ সালে খড়গপুর সদরে ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন দিলীপ ঘোষ। জ্ঞানসিং সোহনপালকে হারিয়ে খড়গপুরে ওড়ান গেরুয়া নিশান। সেই থেকে শুরু।
তবে ২০২১ সালে আর এই কেন্দ্রে দিলীপ ঘোষকে প্রার্থী করেনি বিজেপি। তার বদলে প্রার্থী হন টলি তারকা হিরণ চট্টোপাধ্যায়। তেলেগুরা ঢেলে ভোট দেন হিরণকে। তিনি জিতে যান। কিন্তু কাজের নিরিখে দিলীপ ঘোষের চেয়ে ঢের পিছিয়ে ছিলেন। তাই ছাব্বিশে ফের হিরণকে অন্য আসনে ভোটপরীক্ষায় পাঠিয়ে খড়গপুর সদর দখল করতে দিলীপেই ভরসা রেখেছে পদ্মশিবির। তাঁর সঙ্গে লড়াই তৃণমূলের প্রদীপ সরকার, সিপিএমের দীর্ঘদিনের হোলটাইমার মধুসূদন রায় ও কংগ্রেসের ড. পাপিয়া চক্রবর্তীর।
মূলত তিনটি ইস্যুকে সামনে রেখে ছাব্বিশের ভোটের লড়াইয়ে নামছে খড়গপুর সদর।
প্রথমত, পরিবেশ দূষণ। খড়গপুর শহরের উত্তরে স্পঞ্জ আয়রনের একটি কারখানা নিয়ে জনতার বিক্ষোভ বহুদিনের। কারখানা থেকে দূষণের জেরে কারও চর্মরোগ, কারও ফুসফুসের সমস্যা হচ্ছে। শীতকালে আশপাশের বাড়ির ছাদ কালো গুঁড়োয় ভর্তি হয়ে যায়। তখন বাড়ির পরিবেশও বিশেষ স্বাস্থ্যকর থাকে না। খড়গপুর শিল্পদূষণ প্রতিরোধ কমিটি এনিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে। এই কমিটিতে রয়েছেন নানা পেশা, নানা রাজনৈতিক আদর্শের লোকজন। পরিবেশ দূষণ রোধে তাঁরা জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজ করেন। ভোটের মুখে এই কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে আবেদন জানায়, ভোটে জিতলে এই দূষণ রোধে কাজ করতে হবে। এতে প্রথম সাড়া দেয় সিপিএম। লোকাল ইস্তেহারে কারখানা থেকে দূষণমুক্তির বিষয়টি পয়লা নম্বরে রাখা হয়েছে। এরপর খড়গপুর সদরের প্রাক্তন বিধায়ক দিলীপ ঘোষ এনিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ জানান। তখনও তিনি প্রার্থী হননি। প্রার্থী হওয়ার পর অবশ্য অন্যান্য বিষয় তুলে ধরতে গিয়ে কারখানার ইস্যুটি পিছিয়ে গিয়েছে। সবশেষে তৃণমূল দূষণ নিয়ে সচেতন হয়, তবে ভোটপ্রচারের ময়দানে তা কাজে লাগাতে পারছে না। কারণ, প্রচারে তৃণমূল প্রার্থীর মুখে এনিয়ে একটি শব্দও শোনা যায়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, ওই স্পঞ্জ আয়রন কারখানার সঙ্গে দলের কোনও যোগ আছে, তাই শাসকশিবির চুপ।
দ্বিতীয় সমস্যা কালো জল। ১৯৯৫-৯৬ সালে অর্থাৎ বাম আমলে খড়গপুরে শেষ জলপ্রকল্পের কাজ হয়েছিল। বাড়ি বাড়ি জল সরবরাহ মসৃণ করতে লোহার পাইপ বসানো শহরজুড়ে। এখন তাতে মরচে ধরে কালো জল বেরয়। ফলে জলদূষণও একটা বড় সমস্যা খড়গপুরের। সমস্যা মেটাতে রাজ্য সরকার গত বছর নতুন কাজ শুরুর জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও কাজ হয়নি। এটাও খড়গপুরবাসীর ক্ষোভের একটা কারণ।
তৃতীয়ত, তৃণমূল পরিচালিত খড়গপুর পুরসভা কাজে অত্যন্ত পিছিয়ে। এই অভিযোগ পেয়ে রাজ্যের পুর ও নগরোয়ন্নয়ন দপ্তর পুরবোর্ডটি ভেঙে দিয়েছিল। পরে বিরোধীরা কোর্টে মামলা করলে ফের বোর্ড তৈরি হয়। কিন্তু কাজ না করার হাজার অভিযোগে তৃণমূল পিছিয়ে।
চতুর্থত, সমাজবিরোধীদের আতঙ্ক। খড়গপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, দিলীপ ঘোষই এখানকার প্রথম নেতা, যিনি কুখ্যাত গ্যাংস্টারদের আটকাতে বুক চিতিয়ে লড়েছেন। ভয়ের প্রতিস্পর্ধী হিসেবে ভয়কেই হাতিয়ার করেছেন দিলীপ। তাতে বেশ সাফল্যও পেয়েছেন। অন্তত খড়গপুরবাসীকে ভরসা দিতে পেরেছেন। ২০১৭ সালে খড়গপুরের কুখ্যাত ‘ডন’ শ্রীনু নায়ডুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হন তার একদা ‘গুরু’ রামবাবু। জেলে দীর্ঘদিন কাটাতে হয় রামবাবুকে। পরে জামিন পেয়ে আর অন্ধকার জগতে দেখা যায়নি তাকে। বিশাখাপত্তনমে রামবাবু প্রোমোটিংয়ের সঙ্গে এখন যুক্ত। এভাবেই খড়গপুর কিছুটা দুষ্কৃতীমুক্ত হয়। কিন্তু এখনও পুরোপুরি ভয় কাটেনি। সেটাও একটা বড় ইস্যু এবারের ভোটে।
এদিকে জনতার যত ভরসাই থাক দিলীপের ‘দাবাং’ ইমেজে, তৃণমূলের অস্ত্র সেই দিলীপেরই বিতর্কিত সব মন্তব্য। এসআইআরে এই কেন্দ্রে বেশ ভালো সংখ্যক ভোটারের নামই বাদ পড়েছে। এতদিন তা নিয়ে বিশেষ শোরগোল করেননি ভোটাররা। বরং বিজেপিতে আস্থা রেখে তাঁদের মত ছিল, এই কাজে ভোটার তালিকা শুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই আবহে দিলীপ ঘোষের একটি মন্তব্যে তাঁদের মত ভিন্ন হতেই পারে। খড়গপুর সদরের বিজেপি প্রার্থীর কথায়, ”এসআইআরে যাঁরা বাদ পড়েছে, তাঁরা দেশদ্রোহী।” এহেন কথাবার্তা যে সাধারণ জনমানসে বেশ ধাক্কা দেবে, তা স্বাভাবিক। তৃণমূলের হাতিয়ার এটাই। প্রার্থী প্রদীপ সরকারের বক্তব্য, ”যিনি ভোটারদের নিয়ে এসব কথা বলতে পারেন, যিনি মহিলাদের সম্মান দিতে পারেন না, তাঁকে আপনারা কতটা ভরসা করবেন, ভেবে দেখুন। উনি এত কথা বলেন কীভাবে? ওঁর দল কী করেছে? জেলখাটা আসামিদের ভোটে দাঁড় করায়, ধর্ষকদের মালা পরিয়ে বাইরে বের করে আনে, আর কত বলব?”
সিপিএম প্রার্থী মধুসূদন রায় অবশ্য ইস্যু করেছেন কারখানা দূষণের বিষয়টিকে। তাঁর মতে, আগে মানুষ ভালোভাবে বাঁচুক, তারপর সমস্ত রাজনীতি হবে। ভোটে জিতে এলে আগে এই কারখানা বন্ধ করে দূষণ রুখে খড়গপুরের মানুষকে তাজা হাওয়ায় বাঁচার সন্ধান দেবেন। তবে রাজনৈতিক মহলের মত, সিপিএম দূষণ রোধকে পাখির চোখ করলেও সংগঠনের অবস্থা এতটা ভালো নয় যে ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়।
কংগ্রেস প্রার্থী ড. পাপিয়া চক্রবর্তীর লড়াই দুর্নীতি, ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে। তবে খড়গপুর সদরে একদা জ্ঞানসিং সোহনপালের শক্ত ‘হাত’ এখন নিতান্তই দুর্বল। তাই প্রার্থী যতই লড়াইয়ের চেষ্টা করুন, বিশেষ লাভ হবে না বলেই মত রাজনৈতিক মহলের। সবমিলিয়ে খড়গপুর সদরে পাল্লা ভারী বিজেপিরই।