নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: মৃত্যুশয্যায় বাবাকে দেখতে যাননি। দেননি তাঁর চিকিৎসার টাকাও। বাবার মৃত্যুর পর নিজের মাকে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি বৃদ্ধা মাকে খাওয়া-পরার টাকাও দিতেন না বছরের পর বছর। নিজের ছেলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়ে সেই অর্থ আদায় করতে হয়েছে তাঁকে। এমন ‘গুণধর’ পুত্রকেই কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা আসনে প্রার্থী করেছে বিজেপি। তিনি ধুবুলিয়ার দেশবন্ধু হাই স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক তারক চট্টোপাধ্যায়। যদিও তাঁর আচরণ আদৌ শিক্ষকসুলভ নয় বলে জানিয়েছিল খোদ আদালত। চলতি ভোটপর্বে বাংলায় নারী সুরক্ষা নিয়ে গলা ফাটাতে দেখা গিয়েছে গেরুয়া শিবিরকে। সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডেকে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাতে উদ্যোগী হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তা নিয়ে নানা প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন। সদ্য হলদিয়ার জনসভা থেকে মেয়েদের সম্মান রক্ষার ইস্যুতে নিশানাও করেছেন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে। তার জবাবে এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল আদালতের নির্দেশকে হাতিয়ার করেছে বিজেপি প্রার্থী তারকবাবুর বিরুদ্ধে। বৃদ্ধা মাকে খোরপোশ দেওয়ার বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের কটাক্ষ—‘যিনি নিজের জন্মদাত্রীর উপর অত্যাচার করেন, তাঁর হাতে কৃষ্ণনগর উত্তরের বাসিন্দারা কতটা সুরক্ষিত? বিজেপি বাস্তবেই মা-বোনেদের নির্যাতনকারীর দল!’
বছর তিনেক আগে আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, মা চন্দা চট্টোপাধ্যায়কে প্রতি মাসে ৮,০০০ টাকা করে অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ দিতে হবে তারক চট্টোপাধ্যায়কে। একথা অবশ্য মেনে নিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী স্বয়ং। যদিও তারকবাবুর দাবি, ‘সেই মামলা আর নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এই অপপ্রচার করা হচ্ছে। যেদিন আমার প্রার্থী পদ ঘোষণা হয়েছিল, সেদিন মায়ের কাছে গিয়ে প্রণাম করেছি। তাঁর হাত থেকে মিষ্টি খেয়েছি। তারপরই প্রচারে নামি। সেই ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া আছে। মা এখন আমার সঙ্গেই থাকেন।’ বিজেপি নেতৃত্বেরও সাফ যুক্তি, কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্রে গত লোকসভা নির্বাচনে ৫৩ হাজার ভোটের লিড পেয়েছিল গেরুয়া শিবির। ছাব্বিশের নির্বাচনেও এখানে তৃণমূলের লড়াই বেশ কঠিন হতে চলেছে। সেই কারণেই এসব অপপ্রচার।
মামলার নথি কিন্তু অন্য কথা বলছে। সেখানে আবেদনকারী তারকবাবুর মায়ের অভিযোগ স্পষ্ট, তাঁর স্বামীর অসুস্থতার সময় কোনো চিকিৎসা খরচ বহন করেননি এই বিজেপি নেতা। এমনকি মৃত্যুশয্যাতেও বাবাকে দেখতে আসেননি। বাবার মৃত্যুর পর জোর করে বাড়িতে ঢুকে ঘর দখল করা এবং মাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুনের হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তারকবাবুর বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে আদালত ওই মামলায় বিজেপি প্রার্থীর মায়ের পক্ষে রায় দেয়। নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ২০২২ সালের মার্চ মাসের ৩১ তারিখ থেকে প্রতি মাসে এই খোরপোশ প্রদান করতে হবে তারকবাবুকে। সেইসময় আদালত পর্যবেক্ষণে এও জানিয়েছিল, ‘তারক চট্টোপাধ্যায় পেশায় একজন শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও নিজের মায়ের প্রতি নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁর বৃদ্ধা মা বর্তমানে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।’ যদিও তারকবাবু আদালতে যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। দাবি করেছিলেন যে, মায়ের নিজস্ব ব্যবসা ও সম্পত্তি রয়েছে। কিন্তু বিচারক সেই দাবি নাকচ করে দেন। সরাসরি জানান, একজন সুস্থ ও কর্মক্ষম পুত্রের দায়িত্ব হল তাঁর বৃদ্ধা মায়ের দেখাশোনা করা।
এই রায় প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। সাধারণ মানুষও প্রশ্ন তুলছে, বিজেপি যখন ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ বা নারী সুরক্ষাকে প্রধান নির্বাচনি ইস্যু করছে, তখন তাদেরই প্রার্থীর মায়ের এই করুণ দশা কেন? যে নেতা নিজের মাকে অন্ন দেন না, তিনি কৃষ্ণনগর উত্তরের দায়িত্ব নেবেন কীভাবে?