• উন্নয়নের ছোঁয়ায় আমূল বদল, এবার তৃণমূলের টার্গেট ৫০ হাজারের মার্জিন
    বর্তমান | ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: ২০২১ সাল। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে হাল-হকিকত দেখতে গিয়েছিলাম বেহালা-পূর্ব কেন্দ্রে। ঘোলশাপুর রেল কলোনি পার করে জেমস লংয়ে গাড়ির চাকা পড়তেই মালুম হয়েছিল গর্তগুলি। জেমস লং তখন ভাঙাচোরা। রাস্তায় না ছিল এলইডি আলো, না ছিল পথ নিরাপত্তা বলে কোনো বিষয়। রায় বাহাদুর রোড, বীরেন রায় রোড কিংবা মতিলাল গুপ্ত রোড ধরে একটু ভিতরে ঢুকলে জল জমার যন্ত্রণা ছিল প্রকট। বর্ষা কেটে গেলেও বেহালা-পূর্বের একাংশে অলিগলি থাকত জলের তলায়।

    কাট-টু ২০২৬। পাঁচ বছরে বদলে গিয়েছে জেমস লং সরণি। ঝাঁ চকচকে রাস্তার দু’পাড়ে অসংখ্য দোকান, একাধিক স্কুল। সন্ধ্যার পর আলো ঝলমল করে রাজপথ। বড়ো বড়ো ক্রসিংয়ে হাইমাস্ট আলো। বেহালা চৌরাস্তা সংলগ্ন এই রাস্তা এখন এলাকাবাসীর কাছে ‘রেস্তরাঁ সরণি’। নানা ধরনের খাবারের অজস্র দোকান। রায় বাহাদুর রোড ও বীরেন রায় রোডের নিকাশি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। চওড়া হওয়ায় যানজট কমেছে টালিগঞ্জ করুণাময়ী থেকে ঠাকুরপুকুর পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধী রোডে। জল জমার সমস্যা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে পাঁচ বছরে সবটা হয়ে ওঠেনি। কিছু কাজ এখনও বাকি। মতিলাল গুপ্ত রোডে এখনও জল-যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় বাসিন্দাদের। যদিও নিকাশি ব্যবস্থার ভোল বদলাতে কাজ চলছে জোরকদমে। সমস্যা হল, এলাকার পথ নিরাপত্তা। জেমস লং সরণি ও ডায়মন্ডহারবার রোড মিলিয়ে বছরের প্রথম তিনমাসেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে পথ দুর্ঘটনায়। 

    শাসকদলের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বেহালা-পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। জন্মলগ্ন থেকে এই কেন্দ্রের কোনো ওয়ার্ডে হারেনি ঘাসফুল শিবির। ২০১১, ২০১৬, ২০২১— তিনবারই বেহালা-পূর্বে তৃণমূলের ভোট ৫০-৬০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। গতবারই রত্না চট্টোপাধ্যায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির পায়েল সরকারকে তিনি হারিয়েছিলেন ৩৭ হাজার ৪২৮ ভোটে। এবার এই কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করেছে ঘাসফুল শিবির। তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী প্রার্থী এখানে। তাঁর কথায়, আমি নিজে বেহালার বাসিন্দা। উন্নয়ন হচ্ছে বলেই এলাকার মানুষ প্রতি নির্বাচনে তৃণমূলকে আশীর্বাদ করেন। এবারও বেহালা-পূর্বে জোড়াফুল ফুটবে বলে আমি আশাবাদী। ব্যবধানও বাড়বে। তাঁর কথায়, জয়ের মার্জিন ৫০ হাজার হবে, এটাই টার্গেট। এসআইআর করেও এই ব্যবধান আটকাতে পারবে না বিজেপি।

    তৃণমূল প্রার্থীর কথায় যখন আত্মবিশ্বাসের সুর, তখন প্রচার শুরুর মুখেই নুইয়ে পড়েছে বিজেপি। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রথমে সুনীল মহারাজকে টিকিট দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী দল প্রচার শুরু করলেও তাতে সাড়া মিলছিল না তেমন। প্রার্থীর নাম দিয়ে দেওয়াল লেখাও হয়েছিল কোথাও কোথাও। শেষ মুহূর্তে দিল্লির নেতৃত্ব তাঁর নাম ছেঁটে এখানে প্রার্থী করে শংকর সিকদারকে। তবে তাঁর প্রচারে তেমন ঝাঁঝ নেই। ঠাকুরপুকুরের দাসপাড়া, সেনপাড়া, মাঝিপাড়া, রামকৃষ্ণনগর, গৌরনগর, সারদাপল্লি সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর দেখা এখনও মেলেনি। কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে বেহালায় লড়তে দেখা যাচ্ছে না বিজেপিকে। বিজেপি প্রার্থীর কথায়, বেহালার মানুষকে মেট্রো পরিষেবা উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বেহালা শীলপাড়ার বাসিন্দা অসীম ঘোষ বলছেন, দীর্ঘসময় অতিক্রান্ত হলেও মেট্রো বেহালার মাত্র সাত কিমির মধ্যে ঘোরাফেরা করে।  এই মেট্রো ধর্মতলায় যাবে কবে?

    বরং বিজেপির তুলনায় বেহালা-পূর্বে প্রচারে দেখা যাচ্ছে সিপিএম প্রার্থী -ডাঃ নিলয় মজুমদারকে। তিনি এলাকায় চিকিৎসক হিসাবে পরিচিত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারে তিনি বলছেন নাগরিক পরিষেবার বেহাল দশার কথা। তাঁর কথায়, ‘বেহালার মানুষের মূল সমস্যা স্বাস্থ্যব্যবস্থা। চিকিৎসক হিসাবে সেটা আমার কাছে আরও প্রকট। সরকারি স্কুলে ছাত্র নেই। একটার পর একটা স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হরিদেবপুরের একাধিক রাস্তা ভাঙাচোরা। মতিলাল গুপ্ত রোডে গত তিন বছর ধরে কাজ হয়েই চলেছে। তাও জল-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না এলাকার মানুষ। তাহলে এই সরকারকে মানুষ ভোট দেবেন কেন?’ বিজেপি থেকে ভোট এবার বামেদের বাক্সে ফিরবে বলেই আশাবাদী লালপার্টির কর্মীরা। সেই মনোবলকে আঁকড়ে ধরেই ব্যালট যুদ্ধে নেমেছে সিপিএম। 
  • Link to this news (বর্তমান)