• সাধারণ মেয়ে থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের লড়াই, শিক্ষিকার ইমেজ দিয়ে বাজিমাতের চেষ্টায় বর্ণালি
    এই সময় | ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, হাওড়া: সমাজসেবার প্রতি দায়বদ্ধ থাকাই শুধু নয়, তার সঙ্গে জনসংযোগের ক্ষমতা এবং জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশলই একজনকে রাজনীতির ময়দানে সাফল্য দিতে পারে। সে কথা নিজের জীবনচর্যার মধ্য দিয়েই প্রমাণ করেছেন সাঁকরাইল কেন্দ্রের এ বারের বিজেপি প্রার্থী বর্ণালি ঢালি নস্কর। গ্রামের সাধারণ মেয়ে থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী প্রার্থী হয়ে ওঠা, এই যাত্রাপথ সহজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন পথকেই নিজের অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়ে সম্ভব করে তুলেছেন বর্ণালি। আজ তিনি শুধু এক রাজনৈতিক মুখ নন, বরং এলাকার বহু মানুষের কাছে তিনি এক শিক্ষিকা, পথপ্রদর্শক এবং আশ্রয়স্থল।

    বর্ণালির শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ছিল পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ। ২০০৮ সালে প্রভু জগবন্ধু কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। তবে তাঁর শিক্ষাদানের যাত্রা শুরু হয় আরও আগে, ১৯৯৯ সাল থেকেই। তখন থেকেই একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের আর্টস বিভাগের বিভিন্ন বিষয় পড়াতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে তাঁর পড়ানোর ভঙ্গি এবং আন্তরিকতা পড়ুয়াদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

    পড়াশোনা শেষ করার পরে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পান। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি। পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশন চালিয়ে যেতে থাকেন। বেলতলায় নিজস্ব কোচিং সেন্টার গড়ে তোলেন, যেখানে বহু ছাত্র-ছাত্রী তাঁর কাছে পড়তে আসত। একজন গৃহবধূ হিসেবে সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি, শিক্ষিকা হিসেবে নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে গিয়েছেন বছরের পর বছর।

    বিশেষ করে গরিব ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তাঁর দরজা সব সময়ে খোলা। অনেকেই বেতন দিতে না পারলেও, তিনি তাঁদের বিনামূল্যে পড়ান। কেউ যদি সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দিতে পারে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন তিনি। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। এই সময়েই তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক এবং জনপ্রিয়তা নজর কাড়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের।

    প্রথমে বিজেপির কিছু নেতা-নেত্রী তাঁকে পঞ্চায়েত নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ দেন। সেই উৎসাহেই তিনি প্রথম বার পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রার্থী হন। পরবর্তীতে তাঁর কাজ এবং জনসংযোগে অসামান্য দক্ষতা দেখে বিজেপি নেতৃত্ব তাঁর উপরে আস্থা রাখে। মানিকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে তিনি বিজেপির হয়ে পর পর দু'বার প্রধান নির্বাচিত হন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর কাজ মানুষের মধ্যে আরও আস্থা তৈরি করে।

    বর্তমানে তিনি বিজেপির সদস্য হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন এবং সাঁকরাইল বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক পদের দৌড়ে নাম লিখিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার মূল ভিত্তিই হচ্ছে, মানুষের সমস্যার সমাধান। তিনি মনে করেন, এলাকার উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা জরুরি। বর্ণালি নিজেই বলেন, 'আমার কাছে রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা। এলাকায় অনেক সমস্যা আছে-নিকাশি, রাস্তা, শিক্ষা। এ সবের সমাধান করাই আমার লক্ষ্য।'

    রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরেও তিনি তাঁর প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করেননি। বরং, এখনও নিয়মিত ভাবে ছাত্রছাত্রীদের পড়ান। তাঁর মতে, শিক্ষা সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার, তাই এই কাজ তিনি কোনও দিন ছাড়তে চান না। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন স্ত্রী ও মা। পরিবার, পেশা এবং রাজনীতি-এই তিনটি ক্ষেত্রকে সমান ভাবে সামলে চলাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ তিনি সফল ভাবেই গ্রহণ করেছেন।

    ৪৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে বর্ণালি ঢালি নস্করের এই পথচলা প্রমাণ করে দেয়, ইচ্ছেশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে কোনও লক্ষ্যই অসম্ভব নয়। গ্রামের মাটির গন্ধ মেখে, মানুষের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে তিনি আজ এগিয়ে চলেছেন আরও বড় দায়িত্বের পথে। একজন প্রাথমিক শিক্ষিকা থেকে জনপ্রতিনিধি- এই রূপান্তরের গল্পই আজ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা।

  • Link to this news (এই সময়)