এই সময়: ভোটের ময়দানে এ বার নমোর মুখে উঠে এল কলকাতার ফুটবল ময়দান!চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান যদি মাঠের রাজনীতি ভুলে আরজি কর ইস্যুতে একসঙ্গে পথে নামতে পারে, তা হলে তৃণমূলের শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার সব বিরোধী শক্তি একজোট হতে পারবে না কেন— বিধানসভা ভোটের মুখে বাংলার ভোট প্রচারে এসে ঠারেঠোরে এই প্রশ্নটাই উসকে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদে যে ভাবে ক্রীড়া জগতের প্রতিপক্ষরা দ্বন্দ্ব ভুলে হাত মিলিয়েছিল, মোদী চাইছেন, এ বারের বিধানসভা ভোটের মুখে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সবাই সে ভাবেই জোট বাঁধুক। যদিও ‘সবাই’ বলতে তিনি ঠিক কাদের বোঝাচ্ছেন তা অবশ্য শনিবার দক্ষিণ দিনাজপুরের নির্বাচনী জনসভা থেকে খোলসা করেননি নমো। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগানের এক হওয়ার ‘রেফারেন্স’ টেনে আসলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাম–বামের এক হওয়ার কথাই বলতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ দিন ঠিক কী বলেছেন নমো? দক্ষিণ দিনাজপুরের সভায় বাংলায় মহিলা নির্যাতনের ঘটনাগুলি উল্লেখ করে তৃণমূলকে আক্রমণ শাণাতে শুরু করেন তিনি। মোদীর মতে, আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে খুন ও ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ পথে নেমেছিলেন, তা ঐতিহাসিক। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘কলকাতার মাঠে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের দাপটের কথা গোটা দেশ জানে। দুই দলই জেতার জন্য মাঠে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপায়।
কিন্তু যখন আরজি কর হাসপাতালে এক তরুণী চিকিৎসককে নির্মম ভাবে খুন করা হলো, তখন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগান এর প্রতিবাদে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। আমরা এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম।’ ফের একবার বাংলায় ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ ঘটানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংযোজন, ‘বাংলার মহিলাদের সম্মান ও প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমাদেরও সবাইকে একজোট হয়ে নির্মম সরকারকে শিক্ষা দিতে হবে। যে ভাবে ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগান কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল।’
তাঁর এই মন্তব্য নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে বঙ্গ–রাজনীতিতে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই মতে, বিরোধী ভোট কাটাকাটির ফলে রাজ্যের বেশ কিছু আসনে সুবিধা পেয়ে যেতে পারে তৃণমূল। সেটা ঠেকাতেই বাম কর্মী–সমর্থকদের নিয়ম করে বার্তা দিয়ে চলেছেন বিজেপি নেতৃত্ব। মোদীর এ দিনের আহ্বানও একই উদ্দেশ্যে বলে মনে করছেন অনেকে। গত তিন–চার মাসে বহুবার রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মুখে শোনা গিয়েছে, ‘এ বার ভোটটা তৃণমূল বনাম বিজেপির নয়। মমতা বনাম জনতার। অর্থাৎ, জনতার শিবিরে দলমত নির্বিশেষে সবাই আছে।’ বামেদের আহ্বান জানিয়েও শমীক একাধিকবার বলেছেন, ‘এ বারের ভোটে নিজের দলের পতাকা বাড়িতে রেখে আমাদের সঙ্গে আসুন। তৃণমূলকে হারান। বাংলাকে বাঁচান। তারপরে আবার লাল ঝান্ডা নিয়ে রাজনীতি করবেন।’
এর আগে বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) আবহে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার্তা দিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে যে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা যেন ‘গণতান্ত্রিক ভাবে বদলা’ নেওয়ার জন্য বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেন। এক্ষেত্রে বিজেপির ভোটারদেরও এ বার তৃণমূলে ভোট দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন মমতা। আবার এ দিন মোদী সরাসরি লাল ঝান্ডার কথা না বললেও বোঝাতে চেয়েছেন, বৃহত্তর স্বার্থে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগান যদি এক হতে পারে, তা হলে তৃণমূলের বিরুদ্ধেও ঐক্যবদ্ধ লড়াই সম্ভব।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই ইঙ্গিতপূর্ণ আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না সিপিএম। বরং আরজি করের ঘটনার প্রেক্ষিতে তৃণমূল আর বিজেপিকে এক বন্ধনীতে রাখছে তারা। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ‘আমরাও চাই, ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগানের মতো সবাই আরজি করের নির্যাতিতার বিচার চেয়ে একসঙ্গে পথে নামুক। কিন্তু যারা বিচার চাইল না, অথবা বিচার দিল না, তাদের মাথায় কিন্তু মোদী–মমতারাই বসে আছেন। ফলে এঁদের বিরুদ্ধে একজোট হওয়াটাই এখন সব থেকে জরুরি। এটা বাংলার মানুষ বুঝে গিয়েছেন।’
তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান যদি এক হয়, তা হলে রাম–বাম জোট কেন হবে না, সেটাই বলতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। তলায় তলায় জোট তো আছেই, সেটা সবাই জানে। উনি বোধহয় এ বার প্রকাশ্যে জোটের কথা বলতে চাইছেন।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘বিরোধীদের জোটবদ্ধ সেই মিছিলে নেতৃত্ব দেবে কে? রাম–রহিম, আশারাম বাপুরা? হাথরস থেকে উন্নাও অথবা কাটুয়া থেকে মণিপুর— দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলির আইকন বিজেপি সরকার–ই।’