এই সময়: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছয় গ্যারান্টি নিয়ে বঙ্গ বিজয় করতে মাঠে নেমেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে শুক্রবার গেরুয়া শিবির যে ১৫ দফা সংকল্পপত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে মহিলাদের মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মোদী–শাহদের এই গ্যারান্টিকে স্রেফ ‘চিটফান্ডের গ্যারান্টি’ বলে চিহ্নিত করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার বাংলায় পরপর তিনটি নির্বাচনী সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলার মা–বোনদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার কথা বিজেপি ঘোষণা করেছে। মা–বোনেরা এখন যা পান, তার ডাবল অর্থ পাবেন।’ গেরুয়া শিবিরের এই প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে শনিবার মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের সভায় অভিষেক বলেন, ‘কিছু বিজেপি নেতা যেখানে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ করার কথা বলছেন, সেখানে অমিত শাহ ও মোদী বলেছেন যে, তাঁরা জিতলে তিন হাজার টাকা দেবেন। আমি তাঁদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, আমাদের সরকার যে ভাবে প্রতিটি পরিবারের সব মহিলাকে টাকা দিচ্ছে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো তেমন কোনও প্রকল্প বিজেপি শাসিত রাজ্যে চালু করে দেখান— আমি রাজনীতি থেকে অবসর নেব।’
বিজেপি এখন উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওডিশা, বিহার, অসম, গুজরাট, উত্তরাখণ্ড–সহ বহু রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। সেখানে কেন একটি পরিবারের সব মহিলাকে বিজেপি সরকার ১,৫০০ বা ১,৭০০ টাকা দিচ্ছে না— এই প্রশ্ন তুলেছেন অভিষেক। এই তুলনা টেনেই অভিষেক শনিবার বীরভূমের সাঁইথিয়ার সভায় বলেন, ‘তৃণমূলের গ্যারান্টি মানে লাইফটাইম ওয়ারেন্টি। আর বিজেপির গ্যারান্টি মানে জি়রো ওয়ারেন্টি। যিনি গ্যারান্টি দিচ্ছেন, তাঁকে (ভোটের পরে) খুঁজে পাওয়া যাবে না। মোদীবাবুকে বছরে দেখেন কতবার? এঁদের গ্যারান্টি হচ্ছে চিটফান্ডের মতো— ৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে ১৫ লক্ষ টাকা পাবেন বলা হয়! উনি (মোদী) বলেছিলেন, সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা যাবে, কেউ পেয়েছেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ।’
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার এখন ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলাকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিচ্ছে। সেখানে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে মোদী একই ভাবে মহিলাদের মাসিক টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তৃণমূলের দাবি, দিল্লির ভোটের পরে এক বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও সেখানে গেরুয়া শিবির প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। জোড়াফুল নেতাদের বক্তব্য, অভিষেক বোঝাতে চেয়েছেন, মোদীর গ্যারান্টির কথায় প্রভাবিত হওয়া মানে যে সুযোগসুবিধা মানুষ এখন পাচ্ছেন, তা আরও বেশি পাওয়া তো দূর, একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া। যে ভাবে মানুষ চিটফান্ডে অল্প সময়ে বিপুল লাভের আশায় টাকা ঢেলে শেষ পর্যন্ত সব খোয়ায়, সেই পরিণতি হবে গেরুয়া শিবিরের প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিলে।
অভিষেকের পর্যবেক্ষণ, ২০১৪–এর আগে মোদী যে সব প্রতিশ্রুতির কথা বলেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টে মানুষকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। সাঁইথিয়ার সভায় অভিষেক বলেন, ‘রান্নার গ্যাসের ১২ বছর আগে দাম ছিল চারশো টাকা, এখন দাম হাজার টাকা পার হয়েছে। পেট্রল ছিল ৫০ টাকা, এখন ১০০ টাকা পেরিয়েছে। ডিজে়ল ছিল ৩৮ টাকা, এখন ৯০ টাকা পার হয়েছে। রেলের প্ল্যাটফর্ম টিকিট ছিল ৫ টাকা, এখন ৩০ টাকা হয়েছে। কেরোসিন ছিল ১৪ টাকা, এখন দাম ৩৮ টাকা লিটার। একদিকে মোদী আপনাকে সর্বস্বান্ত করছেন, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুবসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিচ্ছেন। মোদী নিচ্ছেন, দিদি দিচ্ছেন।’ যদিও বিজেপির এক প্রবীণ নেতার পাল্টা বক্তব্য, ‘চিটফান্ড সম্পর্কে তৃণমূলই তো ভালো বলতে পারবে। ২০১১–তে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে তো বাংলায় কত লক্ষ লক্ষ মানুষ চিটফান্ডের প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা তো সবাই দেখেছে! ওঁদের মুখ থেকে তাই এ সব মানুষ শুনতে চায় না।’
বিজেপির ইস্তেহারে আগামী ৫ বছরে বাংলায় ১ কোটি চাকরি সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্ব এটাও ‘জুমলা’ বলে মনে করছেন। বাঁকুড়ার বড়জোড়ার সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘২০১৪–তে উনি বছরে ২ কোটি চাকরি দেওয়ার কথা বলেছিলেন, একটি চাকরি উনি দিয়েছেন?’ বিজেপি–সহ বিরোধীপক্ষ পশ্চিমবঙ্গের কর্মসংস্থানের চিত্র বেহাল বলে প্রচার করলেও এই রাজ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বড় সংখ্যায় চাকরি সৃষ্টি হয়েছে বলে তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য। অভিষেক সাঁইথিয়ার সভায় বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা নাবার্ড যে তথ্য দিচ্ছে, সেখানে উল্লেখ রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র–মাঝারি শিল্পে তৃণমূল আমলে গত ১০ বছরে ১ কোটি ১২ লক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে।’