• অনুপ্রবেশকারী দম্পতির আত্মীয়রা দু’পারেরই ভোটার, প্রেমিকাকে খুঁজতে বাংলায় এসে বাংলাদেশি যুবক হাইকোর্টের দ্বারস্থ
    এই সময় | ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • অমিত চক্রবর্তী

    প্রেমিকার খোঁজ পেতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন বাংলাদেশি এক যুবক। সেই মামলায় হাইকোর্টের নির্দেশে পুলিশ যুবকের প্রেমিকাকে খুঁজে দিল ঠিকই। তবে মামলাটির সূত্রেই সামনে এল অনুপ্রবেশ, বেআইনি ভাবে সীমান্ত টপকে অন্য দেশে ঢোকার পরে, পুলিশের দাবি মতো, অবৈধ ভাবেই অবাধে স্বদেশে ফিরে যাওয়া এবং একই দম্পতির দু'দেশের ভোটার তালিকায় নাম থাকার মতো বিষয়। এবং এ সব সামনে এল এমনটা একটা সময়ে, যখন ভোটমুখী বাংলা উত্তপ্ত ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা 'সার' নিয়ে। অথচ বাংলাদেশের ওই মেয়েকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, এই মর্মে পুলিশের রিপোর্ট পেয়ে হাইকোর্ট মামলাটির নিষ্পত্তি করে দিয়েছে।

    সব কিছুর সূত্রপাত যে পরিবারকে কেন্দ্র করে, সেই মা–বাবা–মেয়ে তিন জনেই বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে সেই মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক হয় সেখানকার এক যুবকের সঙ্গে। হাইকোর্টে জমা পড়া অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সম্পর্ক ভাঙাতে মেয়েকে নিয়ে মা–বাবা সীমান্ত টপকে চলে আসেন এ পারে, উত্তর ২৪ পরগনার নিমতায় মেয়ের পিসির বাড়িতে। প্রেমিকার খোঁজে ও পার থেকে এ পারে আসেন সেই যুবকও, তিনি তাঁর প্রেমিকাকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে মামলা করেন কলকাতা হাইকোর্টে।

    গত সপ্তাহে হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাকের ডিভিশন বেঞ্চে পুলিশ জানায়, তারা আদালতের নির্দেশ মতো সেই মেয়েকে খুঁজে বার করে একটি হোমে রেখেছে। হাইকোর্টে ওই যুবকের মামলায় তাঁর আইনজীবী নীলাদ্রি শেখর ঘোষ যে নথি পেশ করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ওই পরিবারের তিন জন বেআইনি ভাবে সীমান্ত টপকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছিলেন।

    পুলিশি রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁরা বাংলাদেশে ফিরেও গিয়েছেন বেআইনি ভাবেই। হাইকোর্টে যুবকের আইনজীবীর দেওয়া নথি অনুযায়ী, মেয়েটির যে পিসি–পিসেমশাই নিমতার বাসিন্দা, তাঁদের নাম রয়েছে বাংলাদেশের ভোটার তালিকায়। সেই তালিকায় ওই দম্পতির ঠিকানা— পশ্চিম কান্দাপাড়া, নরসিংদী সদর, বাংলাদেশ। সে দেশের জাতীয় পরিচয়পত্রেও স্বামী–স্ত্রী দু'জনের ওই একই ঠিকানা। আবার পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ও আধার কার্ডে তাঁদের ঠিকানা— গমকল বাজার, মন্দিরপাড়া, বিরাটি, নিমতা থানা। হাইকোর্টে জমা পড়া নথি অনুযায়ী, মামলাকারী যুবক ও পার বাংলা থেকে এ পার বাংলায় ঢুকেছেন বৈধ ভাবেই— পাসপোর্ট–ভিসা দেখিয়ে।

    মেয়েকে নিয়ে বাবা ও মা যে বেআইনি ভাবে বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত টপকে এ দেশে এসেছেন, সে কথা পুলিশও রিপোর্ট দিয়ে হাইকোর্টে জানায়। হাইকোর্ট তিন জনকেই গ্রেপ্তার করে হেফাততে নিতে নির্দেশ দেয় পুলিশকে। কিন্তু তার পরে, ৭ এপ্রিল পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দুটো বিষয় জানিয়েছে। প্রথমত, ওই দম্পতি বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, মেয়েটি নাবালিকা, তাই তাকে একটি হোমে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মামলাকারী যুবকের তরফে হাইকোর্টে জমা পড়া বাংলাদেশের বার্থ সার্টিফিকেট অনুযায়ী, তাঁর প্রেমিকার জন্ম ২০০৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ এ বছর ১ এপ্রিল তাঁর বয়স ১৮ বছর ৫৫ দিন।

    এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রথম এফআইআর করেছিল নিমতা থানায়, সেটা ১৪ মার্চ। সেই সময়েও ওই যুবকের প্রেমিকা আর নাবালিকা নন। এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন না–তুলেই মামলাটি নিষ্পত্তি করেছে হাইকোর্ট। অনুপ্রবেশ করে এ পারে ঢোকা এক দম্পতি কী ভাবে অবাধে ও পারে ফিরে যেতে পারলেন, তা নিয়ে পুলিশকেও হাইকোর্ট কোনও প্রশ্ন করেনি। তরুণীর পিসি–পিসেমশাইয়ের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা নিয়েও হাইকোর্ট কোনও নির্দেশ দেয়নি বা পর্যবেক্ষণ জানায়নি। আবার, মামলাকারী ওই যুবক বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে হাইকোর্টে তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দাবি করেছেন, তাঁর প্রেমিকার মা–বাবা সেখানে তাঁদের বাড়িতে ফেরেননি।

    আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, মামলায় নিখোঁজকে খুুঁজে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। সেই মতো পুলিশকে আদালত নিখোঁজ মেয়েটির খোঁজ করতে বলেছিল, পুলিশ তাঁকে খুঁজে দিয়েছে। এই মামলায় আদালতের আর কিছু করার নেই বলে ওই আইনজীবীদের বক্তব্য। কিন্তু তাঁদেরই প্রশ্ন, যাবতীয় নথি পাওয়ার পরেও পুলিশ কেন কোনও পদক্ষেপ করল না? বিশেষ করে যেখানে 'সার' প্রক্রিয়ায় ৯১ লক্ষর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে বলে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলায় এসে শুক্রবারই দাবি করেছেন, বাংলার ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদেরই নাম বাদ গিয়েছে। কিন্তু তার বাইরেও বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ, এ পার–ও পার বেআইনি ভাবে যাতায়াত যেমন চলছে, তেমনই বাংলাদেশের ভোটার তালিকা ও পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা— দু'জায়গাতেই ওই তরুণীর পিসি–পিসেমশাইয়ের মতো লোকজনের নাম থেকেই যাচ্ছে বলে আইনজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য।

    ব্যারাকপুরের কমিশনারেটের এক কর্তার বক্তব্য, 'আদালতে আমরা রিপোর্ট জমা দিয়ে জানিয়েছি যে, মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তবে গোটা ঘটনা নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে।'

  • Link to this news (এই সময়)