• মধুমাসে ভোট, উদাসীন সুন্দরবনের মউলিরা
    এই সময় | ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, গোসাবা: সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দিনরাত এক করে প্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু সুন্দরবনের মউলিদের সে দিকে তাকানোর সময় নেই। কারণ, এখন মধুমাস। সুন্দরবনের বহু মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই সময়টার জন্য। এ সময় পাহাড়ি মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে। গাছের ডালে তারা মৌচাক বানায়। সেই মৌচাক থেকেই মৌলেরা উৎকৃষ্টমানের মধু সংগ্রহ করেন। তারই লোভে জীবন বাজি রেখে তাঁরা ছুটে যান রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ডেরায়। তাঁরা জানেন না, প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারবে কি না। তবু মধুমাসে জঙ্গলে যাওয়ার টান তাঁরা উপেক্ষা করতে পারেন না।

    বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এ বার সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প এলাকায় মোট ৪২৮ জন মৌলে ৩৯টি ভাগে ভাগ হয়ে জঙ্গলে মধু সংগ্রহের জন্য রওনা দিয়েছেন। তার মধ্যে সজনেখালি রেঞ্জ থেকেই গিয়েছে ১৬টি দল। আর বসিরহাট রেঞ্জ থেকে গিয়েছে ৩৩টি দল। মধু সংগ্রহের জন্য তাঁদেরকে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কতজন জঙ্গল থেকে ফিরে ভোট দিতে পারবেন, তার গ্যারান্টি দিতে পারছেন না বনদপ্তরের কর্তারাও। ভোটের মুখে গোসাবার বালি এলাকায় মৌলেদের খোঁজ নিতে গিয়ে হতাশার সুর শুনতে পাওয়া গেল। কেউ কেউ আক্ষেপ করে বললেন, ‘মৌলেরা জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা গেলে শুধু খবরই হয়। প্রশাসনের লোকেরা, রাজনৈতিক নেতারা চাল, ডাল, নগদ টাকা নিয়ে মৌলেদের বাড়িতে দিয়ে যান। তারপরে আর কেউ তাঁদের খোঁজ রাখে না।

    গত প্রায় দেড় দশক ধরে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করছেন গোসাবার বালি ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা শঙ্কর আড়ি।তাঁর সঙ্গেও মধু সংগ্রহ করতে যান কমল বায়েন, বিজন মণ্ডল, সঞ্জু সরকাররা। ভোটের কথা উচ্চারণ করতেই তাঁর মুখে বিরক্তির ছাপ। বললেন, ‘সারা বছর ধরেই মাছ, কাঁকড়া সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করি। বাড়তি উপার্জনের জন্যই মধু সংগ্রহ করতে যেতে হয়। বিধানসভা নির্বাচন আছে জানি। কিন্তু তার জন্য বাড়িতে বসে থাকলে তো আর পেট চলবে না।’

    বালি ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার মৌলে তপন মণ্ডল বলেন, ‘পাঁচ বছর অন্তর বিধানসভা নির্বাচন হয়। সব দলের প্রার্থীরাই আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেন। কিন্তু আমাদের কথা কেউ ভাবে না। জীবনের ঝুঁকি থাকলেও পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে আমাদেরকে জঙ্গলে যেতে হয়। কারণ, এখানে কোনও বিকল্প পেশা নেই।’

    প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, প্রতি বছর বর্ষায় বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় গ্রামের পর গ্রাম। চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকে যায়। আইলা, উম্পুন, ইয়াস, বুলবুলের ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সুন্দরবনের মানুষরা। আজও তৈরি হয়নি স্থায়ী কংক্রিটের নদী বাঁধ। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে কংক্রিটের বাঁধ তৈরির জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা আদায় করেছিলাম। কিন্তু কাজ করতে না পারায় সেই টাকা ফেরত চলে গিয়েছে।’

    গোসাবার বালি দ্বীপের বাসিন্দা তথা বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অনিল মিস্ত্রি বলেন, ‘সুন্দরবনের মৌলিক সমস্যা নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যাথা নেই। ঝড় থেমে গেলে সবাই ভুলে যায়। সুন্দরবনের জন্য আলাদা করে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা দরকার ছিল। এখানকার মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।’

    রাজ্যের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সুন্দরবন। সারা বছর দেশ–বিদেশের পর্যটকরা সেখানে ছুটে আসেন। কিন্তু সুন্দরবনকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারি তরফে সে রকম কোনও উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় হোটেল মালিক এবং পর্যটন ব্যবসায়ীরা। সুন্দরবন টুরিস্ট মেকানাইজ়ড বোট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক আমিরুল মিদ্দে বলেন, ‘প্রতি বছর দেশ–বিদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক আসেন সুন্দরবনে বেড়াতে। কিন্তু রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র সরকার সুন্দরবনের বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। জেটিঘাটগুলোর খুবই খারাপ অবস্থা। পরিকাঠামো নেই বললেই চলে। ভিলেজ ট্যুরিজ়মের কথা বলা হয়েছিল, সেটাও হয়নি।’

    গোসাবা পঞ্চায়েত সমিতির সহকারি সভাপতি তথা তৃণমূল নেতা কৈলাস বিশ্বাস বলেন, ‘আগে যে অবস্থা ছিল, তার থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত মণ্ডলের নেতৃত্বে গোসাবার পাখিরালয় এবং রাস্তাঘাটের অনেক উন্নতি হয়েছে। ইকো ট্যুরিজ়ম পার্ক, চিলড্রেন পার্ক তৈরি করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।’

    গোসাবার বিজেপি প্রার্থী বিকর্ণ নস্কর বলেন, ‘তৃণমূল গোটা সুন্দরবনকে বেচে দিয়েছে। আমরা ক্ষমতায় এলে সুন্দরবনের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে উদ্যোগ নেব।’ গোসাবার আরএসপি প্রার্থী আদিত্য জোরদার বলেন, ‘কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সুন্দরবনের জন্য কিছুই করেনি। বাম নেতৃত্বাধীন সরকার সুন্দরবনের পরিকাঠামোর জন্য সেতু,রাস্তাঘাট,স্কুল, কলেজ, পানীয় জলের ব্যবস্থা করেছে।’

  • Link to this news (এই সময়)