এই সময় কেশিয়াড়ি ও ঝাড়গ্রাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর এ রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর ঘোষণা থেকে ঝাড়গ্রামের ভোটে ঝাড়খণ্ড থেকে লোক ঢোকানোর সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র ভাষায় বিজেপিকে আক্রণম করলেন মমতা। শনিবার পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি এবং ঝাড়গ্রাম শহরে দলীয় প্রার্থীদের প্রচারে জনসভায় এই নিয়ে দলের কর্মীদের সতর্ক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিন কেশিয়াড়ির সভায় তৃণমূল প্রার্থী রামজীবন মান্ডির প্রচারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সরকারি গাড়িতে টাকা নিয়ে ঘোরা ও টাকা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন মমতা। তিনি বলেন, 'অনেক টাকা হয়েছে না। সরকারি গাড়িতে টাকা নিয়ে ঘুরছো। বাহিনীর গাড়িতে টাকা নিয়ে ঘুরছো। সবাইকে বদলি করেছো এই জন্য।' এরপরেই দলের কর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, 'বাইরের লোকের দিকে নজর রাখুন। দেখলেই অভিযোগ করুন।' ভোট কেনার জন্য বিজেপি সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও টাকা ঢোকাতে পারে বলে অভিযোগ এনে মমতার সতর্কবাণী, 'ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর চাইলে কেউ ভুলেও দেবেন না। টাকা পাঠানোর নাম করে আপনার সব টাকা তুলে নেবে ভোটের পরে। আর আপনার টাকায় কিছু কালো টাকা মিশিয়ে দিয়ে ইনকাম ট্যাক্স, ইডি, সিবিআই রেড করাবে। মনে রাখবেন, এই টাকা কালো টাকা। ছোঁবেন না।' ভোটে ইভিএম ট্যাপ করা থেকে নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাই ভোটের দিন যেমন বুথে খেয়াল রাখতে হবে। তেমনই গণনার দিনও সতর্ক থাকতে এদিন কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা দেন।
ঝাড়গ্রামের সঙ্গে ওডিশা এবং ঝাড়খণ্ডের সীমানা রয়েছে। এই পথেই ভোটের দিন পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে ভোট দেওয়ার জন্য লোক নিয়ে আসতে পারে বিজেপি। ঝাড়গ্রাম শহরের জামদা সার্কাস ময়দানে জেলার তৃণমূলের চার প্রার্থীকে নিয়ে জনসভা থেকে এদিন এমন শঙ্কাও প্রকাশ করে দলীয় প্রার্থী ও নেতৃত্বদের সতর্ক করেন মমতা। তিনি বলেন, 'নির্বাচনের আগে আমি তোমাদের সবাইকে বলে যাচ্ছি, মাথায় রাখবে। বিজেপি কিন্তু ঝাড়খণ্ড থেকে লোক ঢোকাবে ভোট দেওয়ার জন্য। ওদের আটকাবে। প্রত্যেকটা রেল স্টেশন দেখবে। সব অফিসারদের একটাই কারণেই চেঞ্জ করে দিয়েছে। যাতে ওরা বুঝতে না পারে। ভোটের আগে টাকা ঢোকাবে, ড্রাগস ঢোকাবে। আবার অশান্তি করবে। যদি শান্তিতে থাকতে চাও তবে আবার দরকার তৃণমূল সরকার।'
জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা নয়াগ্রামের প্রার্থী দুলাল মুর্মু বলেন, 'নেত্রীর আশঙ্কা একেবারেই ঠিক। আমার বিধানসভা ওডিশা বর্ডারে রয়েছে। মাঝেমধ্যেই ওডিশা থেকে বিজেপির নেতারা এখানে এসে সমস্যার সৃষ্টি করছে। ভোটের দিন যে করবে না, তার কি গ্যারান্টি।' যদিও জেলা বিজেপির এক নেতা সমস্ত আভিযোগ নস্যাৎ করে বলেন, 'এ বারের ভোটে তৃণমূলের পরাজয় নিশ্চিত। মানুষ বিজেপির পাশেই থাকবে। তাই তৃণমূল বানানো গল্প বলছে।'
কেশিয়াড়ির জনসভা শেষ করে হেলিকপ্টারে করে দুপুর একটা নাগাদ ঝাড়গ্রামের সভায় পৌঁছন মমতা। মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় ঝাড়গ্রামের রক্তাক্ত দিনের ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে মাওবাদী হানায় শিলদার শহিদ ইএফআর জাওয়ানদের কথাও তুলে ধরেন তিনি। মমতা বলেন, '২০১৭ সালে ঝাড়গ্রামকে জেলা করা হয়েছে। জেলায় কত কাজ হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে। মানুষ শান্তিতে ও সুখে রয়েছে।' ১৯৯৪ সালে বেলপাহাড়ির জোড়াম থেকে জনসংযোগ পদযাত্রা শুরু করেছিলেন মমতা।
সেই পুরনো ইতিহাস উসকে এদিন বলেন, 'লুকিয়ে স্কুটারে চেপে বেলপাহাড়ির জোড়াম গ্রামে মানুষের কাছে পৌঁছেছিলাম। তখন দেখেছিলাম সেখানকার মানুষ গাছের শিকড় সিদ্ধ করে ও লাল পিঁপড়ের ডিম খেয়ে বেঁচে রয়েছে। আমি কথা দিয়েছিলাম ক্ষমতায় এলেই পেট ভর্তি খাদ্যের ব্যবস্থা করব। তা আমি করেছি।' ঝাড়গ্রাম জেলায় উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, "জেলায় চারটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। অলচিকিতে পঠন-পাঠন শুরু হয়েছে। আগামী দিনে এই মাধ্যম থেকেই পড়াশোনা করে ছেলেমেয়েরা আইএএস, আইপিএস হবে। বেঙ্গল আচারি অ্যাকাডেমি তৈরি করা হয়েছে। জঙ্গলমহলের আদিবাসী মেয়েরাও একদিন অলিম্পিক জয় করবে।'
মাওবাদীদের মূল স্রোতে ফেরাতে নয়াগ্রামের জনসভা থেকে যে বিশেষ প্যাকেজ ও স্পেশাল হোমগার্ডের চাকরির ঘোষণা করেছিলেন, এদিন সভায় তাও তুলে ধরেন মমতা। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সাইকেল দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, 'আমার যত শিক্ষা বাচ্চাদের জন্য। নির্বাচনী বিধি রয়েছে বলে বাচ্চাদের থেকে এখন একটু দূরেই রয়েছি।' তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে মহিলাদের সারা জীবন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মমতা বলেন, 'দুয়ারে সরকার আপনারা দেখেছেন। এ বার দুয়ারে স্বাস্থ্য দেখবেন। যেখানে চিকিৎসক আপনার বাড়িতে পৌঁছে যাবে এবং আপনাকে চিকিৎসা পরিষেবা দেবে।'