উন্নয়নই ‘লাল সন্ত্রাসে’র খেজুরিতে তৃণমূলের মূল হাতিয়ার! গেরুয়া মেরুকরণে মজতে নারাজ মানুষ
প্রতিদিন | ১৩ এপ্রিল ২০২৬
একটা সময় বামেদের দুর্গ ছিল খেজুরি! একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে এই এলাকা। বিশেষ করে খুন, সন্ত্রাস আর বোমার শব্দে সবসময় কাঁটা হয়ে থাকতেন এলাকার মানুষজন। যদিও আজ সব অতীত! রাজ্যে পালাবদলের পর খেজুরির পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে গিয়েছে! বোমা-বন্দুকের শব্দ নয়, খেজুরিজুড়ে এখন শুধুই উন্নয়ন। আর সেখানেই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বামেরা। মাথা তুলতে শুরু করে তৃণমূলের পতাকা। মাঝখানে ভাঙাবেড়া সেতু, একপাশে নন্দীগ্রাম, অন্যদিকে খেজুরি। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি রক্ষার আন্দোলনের বহু ঘটনার সাক্ষী থাকা খেজুরিতে নতুন রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয় ২০২০ সালে! শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি যোগ দেওয়ার পরেই জেলার রাজনীতিতে নয়া মাত্রা যোগ করে! বিশেষ করে বিজেপির উত্থান নজরে আসে। গত বিধানসভা এবং লোকসভা ভোটে এই এলাকায় খেলা ঘোরায় বিজেপি।
এই অবস্থায় সিপিএম নেতাদের অনেকেই গেরুয়া শিবিরে যোগ দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বিজেপির মুখ এখন সিপিএম নেতাদের একটা অংশ। এই সিপিএমের ভোটে ভর করেই ২০২১সালে খেজুরি বিধানসভায় বিজেপি জয়লাভ করে এবং বিধায়ক নির্বাচিত হন শান্তনু প্রামাণিক। কিন্তু ২০২৬ সালে ভোটের মুখে হাওয়া ঘুরছে একসময় লালের দাপটে থাকা খেজুরিতে। এবার বামফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছেন একদা সিপিএমের দৌর্দন্ডপ্রতাপ নেতা তথা সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য হিমাংশু দাস। ফলে ২০২১ সালে রামে যাওয়া বামেদের ভোট ফের বামেদের ঘুরতে শুরু করেছে। তাছাড়া খেজুরিতে শান্তনু প্রামাণিককে সরিয়ে বিজেপি প্রার্থী করেছে সুব্রত পাইককে। ফলে দলের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এরফলে পালে হাওয়া পেতে শুরু করেছে সিপিএমের। ফলে বামেদের ভোট ফিরে গেলে ভোট কাটাকুটিতে শেষ চওড়া হাসি কিন্তু হাসবে তৃণমূলই দাবি রাজনৈতিক মহলের।
এদিকে খেজুরি বিধানসভা বিজেপির হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে দিনরাত এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তৃণমূল প্রার্থী রবীনচন্দ্র মণ্ডল। তিনি ভগবানপুর ১ ব্লক তৃণমূলের সভাপতি হলেও দল এবার খেজুরিতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে পাঠিয়েছে। তিনিও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে খেজুরিতে জোড়া ফুলের পতাকা তুলতে রাতদিন এক করতে শুরু করেছেন। রাজ্য সরকারের উন্নয়নের বার্তা নিয়ে হাজির হচ্ছেন মানুষের দোরে। তুলে ধরছেন বিজেপির ব্যর্থতাও। আর বিজেপি, ধর্মীয় মেরুকরণের উপর জোর দিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার করার চেষ্টা করছে।
উল্লেখ্য, খেজুরি-১ ব্লকের ৬টি, খেজুরি-২ ব্লকের ৫টি ও ভগবানপুর-২ ব্লকের ২টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত খেজুরি বিধানসভা এলাকা। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শান্তনু প্রামাণিক ১৭ হাজার ৯৬৫ভোটে তৃণমূল প্রার্থী পার্থপ্রতিম দাসকে পরাজিত করেন। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৫টি পঞ্চায়েত দখল করে বিজেপি। তৃণমূলের দখলে আসে ৮টি পঞ্চায়েত। পাশাপাশি খেজুরি-২ পঞ্চায়েত সমিতির স্থায়ী সমিতির দখল করে বিজেপি। লোকসভা নির্বাচনেও খেজুরিতে এগিয়েছিল তৃণমূল। বর্তমান তৃণমূল শাসিত সরকারের হাত ধরে খেজুরিতে রাস্তাঘাট, পানীয় জল, আলো থেকে শুরু করে নানাবিধ উন্নয়ন হয়েছে। সরকারি জনমুখী প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে মানুষ। এলাকাবাসীর আরও কিছু দাবি রয়েছে। রসুলপুর নদীর উপর কাঁথির সঙ্গে সংযোগকারী সেতুর দাবি খেজুরিবাসীর অনেকদিনের। পাশাপাশি খেজুরিতে রেল যোগাযোগ স্থাপন, দমকল কেন্দ্রের দাবি মেটেনি। প্রাচীন খেজুরি বন্দরের ধ্বংসাবশেষ ও পোস্টঅফিস এবং নিজকসবার হিজলি মসনদ-ই-আলাকে নিয়ে পর্যটন সার্কিট গড়ার দাবিও রয়েছে।
তৃণমূল প্রার্থী রবীনচন্দ্র মণ্ডল বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নে সামিল হতে খেজুরির মানুষ এগিয়েছে এসেছেন। বিজেপি উন্নয়নে ব্যর্থ,সেটা এলাকার মানুষ বুঝে গিয়েছেন। তাই খেজুরি এবার জোড়াফুলের। যদিও বিজেপি প্রার্থী তথা জেলা পরিষদ সদস্য সুব্রত পাইক বলেন, কোথাও সমস্যা নেই। খেজুরিতে ফের পদ্ম ফুটবে। তৃণমূল ফাঁকা আওয়াজ করছে। সিপিএম প্রার্থী হিমাংশু দাস বলেন, তৃণমূলের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সিপিএম নেতা-কর্মীরা একসময় বিজেপির দিকে গিয়েছিলেন। তাদের মোহভঙ্গ হয়েছে। মানুষ ফের সিপিএমের দিকে ফিরছেন। বঞ্চনার জবাব ও উন্নয়নের প্রশ্নে মানুষ আমাদের ভোট দেবে।