এসআইআর বদলে দিয়েছে সমস্ত অঙ্ক! স্থানীয় ইস্যু সামলে মেদিনীপুরের মেদিনীতে ফের ফুটবে ঘাসফুল?
প্রতিদিন | ১৩ এপ্রিল ২০২৬
মেদিনীপুর স্টেশনে নেমে কিছুটা দূর এগিয়ে গেলে ইতিউতি কিছু দোকানপাট, রিক্সাস্ট্যান্ড। একটা রিকশা বা টোটোয় উঠে এগোতে থাকলে চোখে পড়বে পুরনো শহরের জীবন্ত কিছু ছবি। শ্যাওলা পড়া বাড়ির ভগ্ন দেওয়াল, থামে এখনও যেন ইতিহাস কথা বলে! ইটের পাঁজরে লেখা ক্ষুদিরাম বসু, বীরেন্দ্র শাসমল, সতীশ সামন্ত, পরবর্তীকালে বিমল দাশগুপ্তদের ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ারস’ ও তাঁদের সশস্ত্র বিপ্লবের গল্প। এসব দেখতে দেখতে মনে হয় যেন টাইম মেশিনে চড়ে সোজা আপনি পৌঁছে গিয়েছেন ব্রিটিশ আমলের সেইসব দিনগুলিতে। এই মেদিনীপুর শহরের বুকেই তো স্বৈরশাসক পেডি, বার্জদের হত্যা করে স্বাধীনতার স্বপ্নের প্রদীপটি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম বসুরা।
কাট টু। আজকের মেদিনীপুর শহরে এই ইতিহাসের পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে জ্বলজ্বল করছে আধুনিক জীবনের সমস্ত সমস্যা। সরু গলিতে যানজট, নিকাশি সমস্যায় জর্জরিত বাসিন্দারা। এছাড়া চিকিৎসা ক্ষেত্রে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের উপর অতিরিক্ত চাপ। এসবের সমাধান চেয়ে প্রতিবার ভোটের লাইনে দাঁড়ান তাঁরা। তবে এবার এই সব কিছু ছাপিয়ে ছাব্বিশের ভোটে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠছে এসআইআর। পরিসংখ্যান বলছে, মেদিনীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে এসআইআরের ফলে প্রচুর নাম বাদ গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে সংখ্যালঘু সবচেয়ে বেশি। এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে চলেছে এবারের ভোট ময়দানে। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের অন্যতম হটস্পট হয়ে উঠেছে মেদিনীপুর।
মেদিনীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার প্রায় ২ লক্ষ ৯০ হাজার। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি, মহিলা ভোটার ৪৯ শতাংশ। প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। তফসিলি জাতি ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ এবং উপজাতি ভোটার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এসআইআরের পর বিচারাধীন ১১ হাজার ৭৩৩ জনের মধ্যে অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন ৬৭১৮ ভোটার। সবমিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার নাম বাদ পড়েছিল। এতজনের মধ্যে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, বেছে বেছে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আর সেটাই সবচেয়ে বড় ইস্যু হতে চলেছে মেদিনীপুরের ভোটযুদ্ধে। কারণ, এই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের বেশিরভাগটাই ঝুঁকে তৃণমূলের দিকে। এই মুহূর্তে মেদিনীপুর পুরসভা তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। মেদিনীপুর সদর ব্লক ও শালবনির যে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি মেদিনীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সেখানেও দখল রয়েছে শাসক শিবিরের। তবে কিছু পকেটে বিজেপির অবস্থান বেশ দৃঢ় এবং তাদের উত্থান ঘটছে।
২০১৬ সালে সিপিআই-এর সন্তোষ রানাকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী মৃগেন্দ্রনাথ মাইতি। পরের বিধানসভা ভোট অর্থাৎ ২০২১ সালে তৃণমূল আর তাঁকে প্রার্থী করেনি। সেবার টলি অভিনেত্রী জুন মালিয়া দাঁড়িয়েছিলেন মেদিনীপুর থেকে। আর বিপুল ভোট পেয়ে বিজেপি শমিতকুমার দাশকে পরাজিত করেন জুন। শুধু ভোটে জেতাই নয়, জনপ্রতিনিধি হয়ে জুন নিজের এলাকায় যথেষ্ট কাজ করেছেন। তারই পুরস্কার স্বরূপ ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তাঁকে এই কেন্দ্র থেকে লড়াইয়ের ময়দানে এগিয়ে দেয় তৃণমূল। সেই লড়াইয়েও বীরবিক্রমে জয়ী হন জুন।
জুন মালিয়া সাংসদ হওয়ার পর মেদিনীপুরে উপনির্বাচন হয়। এলাকায় দলের পুরনো নেতা সুজয় হাজরা জেতেন। ছাব্বিশের ভোটে ফের তিনিই প্রার্থী। তৃণমূল সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’র মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে সামনে রেখেই প্রচার করছেন তিনি। সুজয় হাজরার কথায়, ”জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রাজ্যের প্রায় সব মানুষকে কোনও না কোনও প্রকল্পের সঙ্গে যোগসূত্র বেঁধে রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ঢালাও উন্নয়ন হয়েছে। তার ভিত্তিতেই মানুষ ভোট দেবেন। এসআইআরের পর প্রমাণ হয়ে গিয়েছে যে বিজেপি আর নির্বাচন কমিশন জোট বেঁধে ভোটে নেমেছে। তাছাড়া এখানে বিজেপির সংগঠন কোথায়? নিজেরা যেসব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে, সেসব জায়গাতেই ঠিক করে কাজ হচ্ছে না আবার বাংলায় এসেছে বড় বড় কথা বলতে!”
সরকারি উন্নয়নের সুফল পেলেও স্থানীয় বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে এখানে। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। শহরের যানজট সমস্যা, নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল দশা, কোথাও কোথাও খারাপ রাস্তা, পথসুরক্ষা না থাকার মতো বিষয়গুলি নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এসবকে হাতিয়ার করেই প্রচারে নেমেছে বিজেপি। প্রার্থী শংকর গুছাইতের প্রধান অভিযোগ, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নাম বদলে দিচ্ছে রাজ্য সরকার। তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কাটমানি সংস্কৃতি এবং মেদিনীপুরের ঐতিহ্যবাহী মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়াকে সামনে রেখে ভোট চাইছেন তিনি। প্রার্থীর কথায়, ”এই সরকার দুর্নীতি, কাটমানির সরকার। একটুও উন্নয়ন হয়নি। পুরসভায় নিজেরা নিজেদের মধ্যে ঝামেলায় ব্যস্ত। কাজ কী করবে? মোদিজিই একমাত্র পারেন মানুষের সমস্ত চাওয়াপাওয়া পূরণ করতে।” তাঁর সমর্থনে ইতিমধ্যে মেদিনীপুর শহরে রোড শো করে গিয়েছেন অমিত শাহ।
অন্যদিকে, বামপ্রার্থী মণিকুন্তল খামরুই বলছেন, ”বিজেপি-তৃণমূলের সেটিং চলছে। মানুষের সমস্যা সমাধানে একমাত্র বিকল্প বামপন্থীরাই। আমরা সেই লক্ষ্যে ভোটের ময়দানে থাকছি।” পাল্লা ভারী কার? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সাংগঠনিক স্তরে তৃণমূল বেশ শক্তিশালী। তবে কোথাও কোথাও গেরুয়া শিবিরের সাম্প্রতি উত্থানে স্পষ্ট, একচেটিয়া নয়, মেদিনীপুরে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। এখন দেখার বিষয় একটাই, এসআইআরের প্রভাব কোন শিবিরে কেমন পড়ে? একে কেন্দ্র করে জনসমর্থন কে, কতটা টানতে পারে।