আশা ভোঁসলে, ভারতীয় সঙ্গীতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৩ সাল থেকে প্রায় আট দশকব্যাপী তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি হিন্দি-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন। অসংখ্য ছায়াছবির গান ও অ্যালবাম রেকর্ড করেছেন, যা তাঁকে এনে দিয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতি। কিন্তু, ১২ এপ্রিল থেকে ‘আশাহীন’ সঙ্গীতের দুনিয়া! রবিবার চিরঘুমে আশা ভোঁসলে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের মহিমা রবি-র মতোই চিরদিন প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে থাকবে। আশা ভোঁসলে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও তাঁর গানের জনপ্রিয়তা এই ধরিত্রীর বুকে কোনওদিন ফিকে হয়ে যাবে না। আশার কণ্ঠের জাদুতে উদ্বেলিত হয় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। গানের নেশায় ছুটে বেড়াতেন পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে। গ্ল্যামারের চাকচিক্য, স্টারডমের পরও কেন বারবার শহর কলকাতায় ছুটে আসতেন আশা ভোঁসলে? তিলোত্তমার প্রতি কেন এই অমোঘ মোহ-মায়া একবার সেই প্রশ্ন করেছিলেন সলিল চৌধুরী ।
কীসের টানে বারবার কলকাতায় ফিরে আসতেন আশা ভোঁসলে? সলিল চৌধুরীর এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই নম্র হাসিতে উত্তর দিয়েছিলেন, কলকাতাতেই রয়েছে তাঁর প্রকৃত প্রেম। কলকাতার সঙ্গে দীর্ঘ ৭০ বছরের সম্পর্ক। পাঁচের দশকের শুরু থেকে এই শহরের সঙ্গে এমন এক বন্ধন তৈরি হয়েছিল যেন মনে হত কলকাতাই তাঁর জন্মস্থান। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রীতি ভেঙে বলিউডি সিনেমার গানে নিজের একটা স্বতন্ত্র সত্ত্বা তৈরি করেছিলেন আশা ভোঁসলে। সেই সময়েই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ডাকে প্রথমবার কলকাতায় এসেছিলেন। সাজসজ্জাতেও ছিল বাঙালিয়ানার ছাপ।
শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’, ‘দত্তা’, রবি ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’-র সঙ্গে কম বেশি পরিচয় ছিল। প্রথমবার শহরটা দেখে মনের মধ্যে উঠেছিল অসংখ্য প্রশ্নের ঢেউ। মুড়ি খেতে দেখে ভেবেছিলেন এটা কী? মুম্বইয়ে তো সকলে ‘পানিপুরি’ খায়, তাহলে কলকাতায় সেটা ফুচকা কেন? বাঙালি সত্যিই মাছে-ভাতে থাকতে ভালোবাসে? এমন বহু প্রশ্ন দানা বেঁধেছিল আশার মনে।
তাঁর বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর অনেকটা সময় কলকাতায় কাটিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে কলকাতাকে আরও ভালো করে চিনেছেন। একজন অবাঙালি শিল্পী যাঁর খ্যাতি বিস্তৃত আসমুদ্রহিমাচল তাঁর মনে কলকাতা নিয়ে এত উদ্দীপনা হওয়াটা অনেককেই অবাক করত। বাঙালির ভাবনা, সংস্কৃতি, খাদ্য, জীবনযাপন নিয়ে খুবই উৎসুক ছিলেন আশা ভোঁসলে। বাঙালির মনকে পড়তে চেয়েছিলেন কারণ একটা জাতির হৃদয়ে বসবাস করলে তবেই তো সংগীতের সুর সেখানে পৌঁছতে পারবে।
বাংলা গানের যাত্রা শুরু ১৯৫৬-৫৭ সালে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের। সেই সূত্রেই কলকাতায় ঘনঘন যাতায়াত লেগেই থাকত। নিউ মার্কেট থেকে কলকাতার অলিগলিগুলোও যেন একটা সময় আশাকে চিনে গিয়েছিল। খোঁজ করতেন চাবি বাঁধা শাড়ি কোথায় পাওয়া যায়? সর্ষে বাটা দিয়ে মাছের স্বাদ আস্বাদনের একটা বাসনা ছিল আশার মনে। কলকাতার সন্দেশ নিয়েই আগ্রহ জেগেছিল আশার মনে। বারবার কলকাতাকে নতুন করে চিনতে চেয়েছিলেন প্রবাদপ্রতীম সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে। রাহুল দেববর্মণের সঙ্গে বিয়ের পরে বাংলায় যাতায়াতটা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
একবার কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহ থেকে অনুষ্ঠান করে সদ্য বেরিয়েছিলেন আশা ভোঁসেল। হঠাৎ পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা। কিংবদন্তিকে সম্বোধন করেছিলেন ‘দুর্গা মা’ আর ‘কালী মা’ বলে। কণ্ঠে ছিল এক কাতর আর্জি। আবার কবে কলকাতায় ফিরবেন আশা? চোখের জল বাধ সাধেনি আশা ভোঁসলেরও। আশা ভোঁসলের মতো একজন অবাঙালি শিল্পীর কলকাতার প্রতি ভালোবাসা, এখানের মানুষদের তাঁর পথ চেয়ে বসে থাকার মতো ঘটনাগুলোই যেন প্রমাণ করে দেয় শিল্পীর কোন জাত হয় না। তাঁর একটাই পরিচয়, ‘শিল্পী’। ঠিক একইভাবে একজন শিল্পীর প্রতি ভক্তের ভালোবাসারও কোনও বেড়াজাল থাকে না।