তুমুল গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর মতুয়া ভোটব্যাংকে সম্ভাব্য ধস নিয়ে গভীর উদ্বেগে বিজেপি, গাইঘাটা, বাগদায় এসআইআর ধাক্কা
বর্তমান | ১৩ এপ্রিল ২০২৬
শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: বনগাঁয় ভোটের মুখে বিজেপির লড়াই আর প্রতিপক্ষের সঙ্গে নেই। সেটা হচ্ছে দলের অন্দরেই। গাইঘাটা ও বাগদা— দুই কেন্দ্রেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। প্রার্থী নির্বাচন ও সংগঠনের অন্দরের লবিবাজি, ঠাকুরবাড়ির প্রভাব নিয়ে এখন লাঠালাঠি চলছে বলে দাবি কর্মীদের। তার উপর এসআইআর-এর জন্য ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ। সব মিলিয়ে সাঁড়াশি চাপে পড়েছে গেরুয়া শিবির– এমনটাই মত রাজনৈতিক মহলের।
গাইঘাটায় বিজেপির অস্বস্তির কেন্দ্রে তাদেরই প্রার্থী সুব্রত ঠাকুর। দলের অন্দরে কানাঘুসো চলছে, স্থানীয় নেতৃত্বের মতামতকে উপেক্ষা করে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে। চারটি মণ্ডলের মধ্যে অন্তত দু’টি সুব্রত-বিরোধী। সেই ক্ষোভেই নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়াইয়ে নেমেছেন বিজেপি নেত্রী তনিমা সেন। তাঁর অভিযোগ, ঠাকুরবাড়ির পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধেই আমার লড়াই। সেজন্যই নির্দল প্রার্থী হয়েছি। গত পাঁচ বছর সুব্রত ঠাকুর কর্মীদের পাশে ছিলেন না। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন বিজেপি বিধায়ক।
গাইঘাটার সমীকরণকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে এসআইআর। নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতুয়া সম্প্রদায়কে আশ্বাস দিয়ে এসেছে বিজেপি। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির ফানুস চুপসে গিয়েছে বলেই দাবি অনেকের। খসড়া তালিকা থেকে ৬,৭৭০ জনের নাম বাদ পড়ার পর বিচারাধীন ছিল ২৩,২৭৮ জন। তার মধ্যে বাদ গিয়েছে ১৯,৬৩৮। সব মিলিয়ে প্রায় ২৬,৪০৮ নাম ভোটার তালিকা থেকে উধাও। সিংহভাগই মতুয়া সম্প্রদায়ের। বনগাঁ মহকুমাজুড়ে এই সংখ্যাটি প্রায় ৮৬ হাজারে পৌঁছেছে। যে মতুয়ারা একসময় বিজেপিকে উজাড় করে সমর্থন দিয়েছিলেন— লোকসভা থেকে বিধানসভা, একাধিক নির্বাচনে তাদের জয়ের ভিত গড়েছিলেন, সেই ভিতেই এবার বড়োসড়ো ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাগদায় ছবিটা আলাদা নয়, বরং আরও তীব্র। এখানে প্রার্থী হয়েছেন শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী সোমা ঠাকুর। অভিযোগ, স্থানীয় সংগঠনকে কার্যত অন্ধকারে রেখে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ক্ষোভে ফুঁসছে বিজেপির একাংশ। সেই ক্ষোভের মুখ হয়ে নির্দল প্রার্থী হয়েছেন দু’বারের বিধায়ক দুলাল বর। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, সেখান থেকে বিজেপি— দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় এলাকাজুড়ে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব এখনও যথেষ্ট। দুলালবাবুর কথায়, ঠাকুরবাড়ির পরিবারতন্ত্র এবং বহিরাগত প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। সেজন্য আমি নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়াইয়ে নেমেছি। জিতলে নির্দল বিধায়ক হিসাবেই মানুষের পাশে থাকব।
এদিকে, বাগদায় বিজেপির অন্দরে দ্বন্দ্বের আরেকটি কারণ সাংগঠনিক টানাপোড়েন। গাইঘাটায় সুব্রত ঠাকুরের হয়ে কাজ করা শান্তনু ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ কর্মীদের একটি বড় অংশকে এবার বাগদায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে গাইঘাটায় যেমন দলের সাংগঠনিক শক্তি কমেছে, তেমনই বাগদায় পুরানো বনাম নতুনের গোষ্ঠী সংঘাত তীব্র হয়েছে। দুই কেন্দ্রেই বিষয়টি ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা।
এই আবহে বিজেপির নীচুতলার একাংশের অভিযোগ, বিদ্রোহী প্রার্থীদের আড়ালে থেকে মদত দেওয়া হচ্ছে, যাতে বিজেপির ভোট ভাগ হয়। যদিও এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে বনগাঁ জেলা তৃণমূল সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস বলেন, বনগাঁর চারটি কেন্দ্রেই তৃণমূল জিতবে। নির্দল প্রার্থীদের টাকা দিয়ে মদত দেওয়া আমাদের সংস্কৃতি নয়। আর বিজেপির বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি বিকাশ ঘোষ জানিয়েছেন, দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কোথাও নেই। সবটাই তৃণমূলের সাজানো। বিজেপি ভোট পাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্যই। তাছাড়া এসআইআরে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, প্রত্যেকেরই নাম থাকবে।
সব মিলিয়ে বনগাঁ মহকুমায় বিজেপির লড়াই এখন বহুমুখী। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ঠাকুরবাড়ির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক, মতুয়া ভোটব্যাংকে সম্ভাব্য ধস– সবগুলিই বিজেপির গভীর উদ্বেগের কারণ।