এই সময়: গত বারের মতো এ বারেও বিধানসভা ভোটে বাংলার ২৯৪টি কেন্দ্রে তাঁকেই তৃণমূল প্রার্থী মনে করার আহ্বান জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টক্কর নিতে এ বার একই কৌশল নিলেন নরেন্দ্র মোদী। রবিবার শিলিগুড়ির কাওয়াখালির জনসভা থেকে তিনিও নিজেকে সব কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করলেন! ফলে বাংলার বিধানসভা ভোট এ বার আরও বেশি করে মোদী বনাম মমতায় কেন্দ্রীভূত হতে চলেছে বলে ব্যাখ্যা রাজনৈতিক মহলের।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, নিজের জনপ্রিয়তার ভরপুর ব্যবহার করতেই প্রতিবার ভোটের মুখে মমতা নিজেকে সব কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেন। ২০১৬ বিধানসভা ভোট হোক বা ২০২৪–এর লোকসভা নির্বাচন— প্রতিবারই এই আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচনেও তাই ঝুঁকি না নিয়ে একই পথে হেঁটেছেন মমতা। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের মালবাজারে নির্বাচনী সভা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘কে প্রার্থী দেখতে হবে না। মনে করুন, ২৯৪টি কেন্দ্রে আমিই প্রার্থী।’
মমতা যখন নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ব্যবহার করে তৃণমূল প্রার্থীদের জেতাতে চাইছেন, ঠিক তখনই নরেন্দ্র মোদীও ঝাঁপালেন নিজের জনপ্রিয়তার ছাপ বাংলার বিজেপি প্রার্থীদের গায়ে সেঁটে দিতে। এ দিন কাওয়াখালিতে প্রধানমন্ত্রীর সভামঞ্চে দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি জেলার সব বিজেপি প্রার্থী হাজির ছিলেন। তাঁদের দেখিয়ে নমো বলেন, ‘এঁরা সবাই মোদী।’ এর পরই ওই বিজেপি প্রার্থীদের জেতানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংযোজন, ‘আপনারা সিপিএম, কংগ্রেস, তৃণমূলকে সুযোগ দিয়েছেন। একবার মোদীকে সুযোগ দিন।’ মনে রাখতে হবে, এখানে প্রধানমন্ত্রী ‘মোদীকে সুযোগ দিন’ বলতে বিজেপি প্রার্থীদের কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। কারণ, মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বিজেপি প্রার্থীদের ‘মোদী’ বলে আগেই সম্বোধন করেন মোদী।
কেন বাংলার ২৯৪টি কেন্দ্রে মমতাদের নয়, মোদীদের জেতানোর আহ্বান তিনি জানাচ্ছেন, তার কারণও এ দিন কাওয়াখালির মঞ্চ থেকে ব্যক্ত করেছেন নমো। তাঁর কথায়, ‘বাংলার মহিলাদের সুরক্ষার জন্য, অনুপ্রবেশ থেকে বাংলাকে বাঁচানোর জন্য, বাংলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ বার একটা সুযোগ মোদীকে দিন।’ বাংলা থেকে ভয়ের শাসন দূর করে ভরসার পরিবেশ তৈরির জন্যও মোদীকে সু়যোগ দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
তবে শুধু মমতাকে কাউন্টার করার জন্যই নয়, বিজেপির অন্দরে প্রার্থী অসন্তোষে প্রলেপ লাগাতেও দলীয় প্রার্থীদের প্রধানমন্ত্রী এ দিন ‘মোদী’ বলে সম্বোধন করেছেন বলে মনে করছে অনেকে। বহু আসনে প্রার্থী বদলের দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ হয়েছে সল্টলেকে রাজ্য বিজেপি দপ্তরে। চাপে পড়ে কিছু আসনে প্রার্থী বদলেও দিতে হয়েছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে। যেমন, বিজেপির প্রথম প্রার্থী তালিকায় ময়নাগুড়ি কেন্দ্র থেকে সিটিং বিধায়ক কৌশিক রায়কে টিকিট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভের মুখে পড়ে পরবর্তীতে ওই কন্দ্রে প্রার্থী বদল করতে হয় পদ্ম নেতৃত্বকে। ময়নাগুড়ি কেন্দ্রে পরিবর্তিত বিজেপি প্রার্থীর নাম ডালিম রায়।
এ দিন মোদীর সভামঞ্চে তিনিও হাজির ছিলেন। উত্তরবঙ্গের আরও অনেক আসনেই দলীয় প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ আছে বিজেপির অন্দরে। গেরুয়া শিবিরের অনেকের আশঙ্কা, এই অসন্তোষের প্রভাব পড়তে পারে বিজেপির ভোটবাক্সে। পার্টির অন্দরে প্রার্থী সংক্রান্ত এ হেন অসন্তোষ সামাল দিতেই প্রধানমন্ত্রী সব কেন্দ্রের প্রার্থীকে ‘মোদী’ বলে বর্ণনা করেছেন। তৃণমূল অবশ্য মনে করছে, বাংলায় বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া। তাই মোদী নিজেকেই ‘মুখ’ করে প্রচার শুরু করেছেন। দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর কথায়, ‘আসলে বিজেপির বাংলায় কোনও নেতা নেই। কোনও মুখ নেই। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি নেতারা বাংলার ক্ষমতায় আসার দাবি করেন। মুখ্যমন্ত্রী কি নরেন্দ্র মোদী হবেন?’