মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভালোবেসে বিয়ে করেন আশা ভোঁসলে, পাত্র গণপতরাও ভোঁসলে। কিন্তু এই সম্পর্ক মেনে নেননি দিদি লতা মঙ্গেশকর। এদিকে শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা একজন গায়িকাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও ছিল নানা জটিলতা। দাম্পত্য জীবন দ্রুতই কঠিন হয়ে ওঠে, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়ে একসময় ঘর ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ফিরে আসেন নিজের পরিবারের কাছে। এরপর জীবনের নতুন অধ্যায়।
দম মারো দম
একটু হলেই হারিয়ে যেত বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক গান! ‘দম মারো দম’ যা এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে, সেটিই নাকি ছবিতে রাখতে চাননি দেব আনন্দ! সেই গল্প ফাঁস করেছিলেন স্বয়ং আশা ভোঁসলে। ১৯৭১ সালের ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ছবির জন্য হিপি সংস্কৃতি গানে রাখতে চেয়েছিলেন সুরকার রাহুল দেব বর্মণ ও গীতিকার আনন্দ বক্সী। সেই মতোই তৈরি হয় গান। কিন্তু গানের কথায় নাকি আপত্তি করেন দেব সাহেব স্বয়ং! তাই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঠিক তখনই দৃঢ় কণ্ঠে সামনে আসেন আশা, ‘এই গান চলবেই!’ তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসেই শেষমেশ ছবিতে জায়গা পায় গানটি। পর্দায় জিনত আমনের উপস্থিতি আর আশার মাদকতাময় কণ্ঠ মিলিয়ে ‘দম মারো দম’ হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ। যার জাদু আজও অটুট।
ঝাড়ু লাল গোলাপের প্রেম
সময়টা পঞ্চাশের দশকের শেষ, ১৯৫৬। আশা ভোঁসলে তখন ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় গায়িকা। একদিন শচীন দেব বর্মণের স্টুডিয়োতে গান রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত আশা। সেই সময়ই স্টুডিয়োর কালো কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে এক তরুণ মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন তাঁকে। তিনি রাহুল। তখনও বাবার সহকারী, কলেজপড়ুয়া। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর স্বপ্নের গায়িকা এ বিশ্বাসই হচ্ছিল না! ততদিনে রেডিয়োতে আশার গাওয়া মারাঠি নাট্যসঙ্গীত শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন রাহুল দেব বর্মণ। গান শেষ হতেই আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। খাতা এগিয়ে দিয়ে চেয়ে বসেন একটি অটোগ্রাফ। সেই সই-শিকারি তরুণই একদিন হয়ে উঠবেন ভারতীয় সঙ্গীতের ‘রকস্টার’ সুরকার, আর আশার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নায়ক। রাহুলকে আদর করে ‘বাবস’ নামে ডাকতেন আশা।
১৯৮০ সালে বিয়ে। কিন্তু সম্পর্কটা কখনওই ছিল না চেনা ছকে বাঁধা। কখনো অভিমানে কথা বন্ধ কখনো দুরন্ত প্রেম। পঞ্চম মানেই হাসি, মজা। সেরকমই মজার ছলে আশাকে দিয়েছিলেন এক অদ্ভুত উপহার। একটা ঝাড়ুর সঙ্গে একটা গোলাপ! সংগীতের সাধনায় তাঁদের জুটি ছিল অনন্য। তৈরি হয়েছিল ‘ইয়ে লড়কি জারাসি দিওয়ানি লাগতি হ্যায়’, ‘প্যায়ার কা নাগমা হ্যায়’, ‘কতরা কতরা মিলতি’, ‘পিয়া তু’, ‘চুরা লিয়া’র মতো অজস্র কালজয়ী গান।
লতা-আশা মিথ
ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে দুই নক্ষত্র। তবে এই দুই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিরচর্চিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র গল্প। শুধুই গল্প নাকি কিছু সত্যিও রয়েছে? লতা মঙ্গেশকর নিজেই জানিয়েছিলেন, আশার প্রথম স্বামী গণপতরাও ভোঁসলে-এর কারণে তাঁদের সম্পর্কে প্রথম ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। তাঁর ধারণা ছিল, লতার প্রভাবেই আশা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। এর জেরে একসময় দুই বোনের মধ্যে যোগাযোগও কমে যায়। তবে এই দূরত্ব কখনও পেশাগত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়নি। বরং আশা ভোঁসলে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘ও আমার দিদি, আমার প্রিয় শিল্পী। মানুষ গল্প বানাতে ভালোবাসে। কিন্তু রক্ত জলের চেয়ে ঘন।’ লতা মঙ্গেশকরও স্বীকার করেছিলেন, তাঁদের গানের ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, আশা যে ধরনের গান গাইতে পারতেন, তা লতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনে সাময়িক দূরত্ব থাকলেও, তাঁদের সম্পর্কের ভিত ছিল গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় গড়া।
চুরা লিয়া
পঞ্চম বরাবরাই অদ্ভুত। এক দিন আশা ভোঁসলেকে নিয়ে শপিং-এ বেরিয়েছেন। বেরিয়ে বেমালুম ভুলে গেলেন শপিংয়ের কথা। গেলেন লং ড্রাইভে। ফেরার পথে আশা মনে করালেন শপিং-এর কথা। এরপর দু’টো কাচের গ্লাস কিনে বাড়ি ফেরা। আর সেই কাচের গ্লাসে চামচ ঠুকেই নাকি ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিলকো’-র মিউজিক কম্পোজ করে ফেলেন।
বঙ্গভূষণ সম্মান
২১ মে, ২০১৮। আশা ভোঁসলেকে বঙ্গভূষণ সম্মান জানায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নজরুল মঞ্চে বঙ্গভূষণ সম্মানের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে আজ সম্মানের দিন। ২০১১ সাল থেকে আমরা এটা চালু করেছি। আশাজিকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা সম্মানিত। আমাদের হৃদয়ে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে আশাজি, লতাজির নাম।’ আশা ভোঁসলেকে গান শোনানোর অনুরোধও করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে দু’কলি গানও শুনিয়েছিলেন — ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না ...’