• যেতে দাও আমায় ডেকো না
    বর্তমান | ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • অভিভাবকের মতো ছিলেন
    আরতি মুখোপাধ্যায়
    • ভালো শিল্পী তো বটেই। একইসঙ্গে ভালো মনের মানুষ ছিলেন আশাজি। গান গাওয়ার ধরন আরও কীভাবে ভালো করা যায় সবসময় সেটা চেষ্টা করতেন। কতগুলি চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল, যা আর কারও মধ্যে দেখিনি। অনেক গানও আমরা একসঙ্গে গেয়েছি। এত বড় শিল্পী হওয়া সহজ কথা নয়। গান কীভাবে দর্শকের মধ্যে আরও পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা সবসময় করতেন। পঞ্চমদার বাড়ির কাছে আমার বাড়ি ছিল। কোনো দরকার হয়ে আশাজি ডেকে পাঠাতেন। পঞ্চমদার সঙ্গে সরস্বতী পুজোতে বাড়িতে রান্নাবান্না করতেন। কত স্মৃতি ভিড় করে আসছে। বড় দিদি, অভিভাবকের মতো ছিলেন। সেই সম্পর্কটা অতীত হয়ে গেল।

    নিজের দিদি মনে হতো ওঁকে
    সাধনা সরগম
    • কিংবদন্তি। সংগীত সফর শুরু করার পর থেকেই ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। যতবার দেখা হয়েছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। রাজেশ রোশনের কম্পোজিশনে ‘খুন ভরি মাং’ ছবিতে ‘ম্যায় হাসিনা গজব কি’ গান গেয়েছিলাম আশাজির সঙ্গে। পঞ্চমদার সুরেও আশাজির সঙ্গে গেয়েছি। কয়েক বছর আগে একটি মারাঠি ছবিতেও ডুয়েট করেছি। ছবির গানের ক্ষেত্রে সবসময় বলতেন, গাওয়ার সময় মনে করতে যে ওই চরিত্রটাই আমি। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা ছিল। ওঁর সাহস, শক্তি কুর্ণিশযোগ্য। ওঁর সঙ্গে মিশলে মনে হতো বাড়ির লোকেদের সঙ্গে রয়েছি। মনে হতো, নিজের দিদি।

    ভগবানপ্রদত্ত প্রতিভা
    হৈমন্তী শুক্লা
    • উনি যে আশা ভোঁসলে, তা কাছ থেকে মিশে কখনো বুঝতে পারিনি। হয়তো বুঝতে দেননি। একবার একটা ছবির রেকর্ডিংয়ে গিয়েছি। আমার পরে ওঁর রেকর্ড করার কথা। আমার হয়ে যাওয়ার পর ভয়ে ভয়ে চলে আসছিলাম। আমাকে ডেকে পাঠালেন, ‘হৈমন্তী ইধার আও’। গিয়ে বসলাম। আমাকে খুঁটিনাটি সমস্ত প্রশ্ন করলেন। বুঝতে চাইলেন, কোন পরিস্থিতিতে গানটি আসবে। তারপর গাইলেন। ভগবানপ্রদত্ত প্রতিভা। শিল্পী হিসেবে ওঁকে নিয়ে কথা বলা ধৃষ্টতা, তবে মানুষ আশার যে ব্যপ্তি, তা সত্যিই চমকে দেয়।

    প্রথম গানেই ওঁর আশীর্বাদ পেয়েছি
    আলিশা চিনয়
    • আশাজি আর লতাজি। ভারতের সংগীত জগৎকে ব্যাখ্যা করতে এই দু’টি নামই যথেষ্ট। বাপি লাহিড়ির কম্পোজিশনে ‘অ্যাডভেঞ্চার্স অব টারজেন’ ছবির ‘টারজেন মাই টারজেন’ গানটি রেকর্ড করতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। প্রথম গানের রেকর্ডিং আর সেখানেই আশাজির মতো মানুষ...। আমি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সন্ধ্যায় রেকর্ডিং শেষ হয়ে গিয়েছিল। উনি ওখানেই ছিলেন। বাপিদাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে গেয়েছে?’ বাপি দা উত্তর দিলেন, ‘একজন নতুন আর্টিস্ট’। এরপর ডাবিং স্টুডিওর ভিতরে এলেন। আমি পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ চাইলাম। বললেন, ‘খুব ভালো গেয়েছো’। প্রথম গান গেয়ে, ওঁর মতো শিল্পীর কাছ থেকে আশীর্বাদ পেয়ে মনে হয়েছিল জীবনে হয়তো সবকিছু পেয়ে গিয়েছি।

    আশাজির গান থেকে যাবে
    প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
    • আশাজির বাংলা গান ছোটো থেকে শুনেছি। ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল ওঁর সঙ্গে। আমার মনে হয় না, গোটা ভারতে এমন কেউ রয়েছেন, যিনি আশাজির গানের ভক্ত নন।

    আমার কণ্ঠস্বর চলে গেল
    দেবশ্রী রায়
    • ‘আর কত রাত একা থাকব’, ‘তুমি আমার নয়ন গো’, ‘বনেরও ময়ূর মেলেছে পাখা’, ‘বাজল যে ঘুঙরু’... কত গান! আশাজি চলে গেলেন। আমার কণ্ঠস্বর চলে গেল। ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমার কেরিয়ারে আমি যত আশাজির গান উপহার পেয়েছি, তা আর কেউ পাননি। গানের মধ্যে অভিনয় ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। এছাড়া ফ্লেক্সিবিলিটিও দুর্দান্ত। যে মুডে গান গাইছেন, সেই মুডে ঢুকে যেতেন। আমি আর আমার দিদি যখন ‘রুমকি ঝুমকি’ হিসেবে নাচ করতাম, বোম্বে থেকে বড়ো কোনও শিল্পী এলে আমরা সেই শো-এ থাকবই। অনেক আর ডি বর্মণ-আশা ভোঁসলে নাইটে ওঁরা গেয়েছেন, আমরা নেচেছি। কলকাতা থেকে পরিচালক, প্রযোজক তখন রেকর্ডিং করাতে যেতেন। আশাদি জানতে চাইতেন, ‘কোন আর্টিস্ট লিপ দেবেন? আমি সেই স্টাইলে গাইব’। তখন বলা হতো, দেবশ্রী রায়। উনি বলতেন, ‘রুমকি ঝুমকি কা রুমকি বোলো না। রুমকি কে লিয়ে গানা হ্যায়, ঠিক হ্যায়...।’
    যখন প্রথম শুনলাম, ‘ত্রয়ী’তে উনি গাইবেন, ‘কথা হয়েছিল...’, ‘আরও কাছাকাছি আরও কাছে এসো’, ‘জানা অজানা পথে চলেছি...’— ওটা শুনে আমি দু’রাত ঘুমোতে পারিনি। ‘ত্রয়ী’ই প্রথম কমার্শিয়াল ছবি, যেখানে বাংলার মানুষ দেবশ্রী রায়কে গ্রহণ করলেন। আমার কেরিয়ারে আমি আশাজি ছাড়া অসম্পূর্ণ।

    যেখানে থাকবেন সেখানেই সুর সৃষ্টি করবেন
    ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত
    • আমাদের সমগ্র সাংস্কৃতিক সুর, সংগীতের সমস্ত বিষয়ের মধ্যে ছিলেন। আমার মনে হয়, এরকম নক্ষত্ররা কখনো কখনো খসে পড়ে। জানতাম শরীর ভালো নেই। ওঁর মতো শিল্পীরা কখনো চলে যান বলে মনে হয় না। ওঁরা থেকে যান আমাদের সকলের নিবিড় ভালোবাসায়। আমার অনেকগুলি প্লেব্যাক আশাজি করেছিলেন। উনি যেখানে থাকবেন, সেখানেই হয়তো সুর সৃষ্টি করবেন।

    ওঁর সঙ্গে ডুয়েট করার সুযোগ পেয়েছি, এটা সৌভাগ্য
    সৈকত মিত্র
    • আশা ভোঁসলে আর লতা মঙ্গেশকর ক্ষণজন্মা। পরিবারসূত্রেই আলাপ। ছোটো থেকে চিনি। বাবার (শ্যামল মিত্র) প্রিয় শিল্পী ছিলেন আশা ভোঁসলে। আমি প্রথম দেখেছিলাম বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজোতে যখন এসেছিলেন। আমাকে পাড়ার এক দাদা বলেন, আশাজি এসেছেন, বাবাকে খবর দে। আমি ছুটে এসে বাড়িতে জানাই। আশা আন্টিকে নিয়ে বাড়িতে এনেছিলাম। অনেকক্ষণ বসে গল্পগুজব হল। চা খেলেন। এরপর নানা রেকর্ডিংয়ে দেখেছি। আমার সৌভাগ্য... ‘পুরুষোত্তম’ সিনেমায় ওঁর সঙ্গে একটা গান ডুয়েট গাইবার সুযোগ হয়েছিল। আরডি বর্মণের সুরে। আমার প্রথম মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ ‘মিষ্টি মধুর’ বলে একটা ছবিতে। সেখানে একটি গান আমার সুরে গেয়েছিলেন।

    রসগোল্লা খাওয়ানো হল না...
    সুপর্ণকান্তি ঘোষ
    • যুগাবসান। এর থেকে বেশি কিছু সত্যিই বলার নেই। মনে আছে, একবার বাবার (নচিকেতা ঘোষ) সঙ্গে রেকর্ডিংয়ে গিয়েছিলাম। ‘মৌচাক’ আর ‘স্বয়ংসিদ্ধা’... এই দু’টি ছবির একসঙ্গে রেকর্ডিং। আশাজি ছিলেন। তখন অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। আমাকে দেখে বললেন,‘বাবু কলকাতায় এলে রসগোল্লা খাইয়ো। আর খাওয়ানো হল না...।’ এমন একজন মানুষের চলে যাওয়া... অপূরণীয় ক্ষতি।

    গানের মধ্য দিয়েই আশাজি চিরকালীন
    শংকর মহাদেবন
    • মা সরস্বতীর নিবাস ওঁর কণ্ঠে। ভারতের সংগীতজগতের জন্য একটা বিরাট দুঃখের দিন। বিশ্বাসই করতে পারছি না। নিজের দুঃখ, অনুভূতি প্রকাশ করার মতো ক্ষমতা নেই। ভীষণ কাছের মানুষ ছিলেন। পারিবারিক বন্ধু। প্রতিটি ভারতীয় আজ হৃদয়ভঙ্গ হয়েছে। তবে দিদি আর ওঁর গান কখনো মলিন হবে না... গানের মধ্যে দিয়েই দিদি চিরকালীন।

    যুগের অবসান
    পেয়ারেলাল
    • ‘ঢল গ্যায়া দিন’, ‘কোই শহরি বাবু’...এর মতো কত গান আমার সংগীত পরিচালনায় গেয়েছিলেন আশাজি। ওঁর কণ্ঠ আর লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলাল জুটির সংগীত— এক স্বর্ণযুগ ছিল। আশা দিদির সম্পর্কে কথা বলতে গেলে চোখে জল এসে যাচ্ছে। ওঁকে পরবর্তী প্রজন্ম গানের মধ্যে দিয়েই মনে রাখবে। আশা দিদি কোথাও যাবে না।

    আশাজি উদাহরণ হয়ে থাকবেন
    শান
    • আশাজি আমাদের গর্ব। ওঁর মতো কেউ নেই। প্রত্যেকটা গান পারফেকশনিস্ট ছিলেন। ওঁর জীবনও যেভাবে কাটিয়েছেন, তা প্রণাম করার মতো। শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে গেলেন। উনি উদাহরণ হয়ে থাকবেন।
  • Link to this news (বর্তমান)