বিধানসভা অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্ব হয়ে যাওয়ার পর বিতর্ক চলছে নানা বিষয়ে। কংগ্রেসের এক বিধায়ক গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে বলছেন, গোটা রাজ্যে ‘কুইনাইন’ পাওয়া যাচ্ছে না। এই কুইনাইনের স্বল্পতার জন্য সরকার বাহাদুরকে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে। চারিদিকে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, মশা বাড়ছে। কালো মশা। এমনকী, অনেক জায়গায় সাদা মশা দেখা যাচ্ছে। সুতরাং, এখন মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।আপনি হয়তো ভাবছেন, বিধানসভায় কুইনাইনের স্বল্পতা নিয়ে আলোচনা! সেটা আবার কবে হল?
আসলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বয়স এখন কত, সেটা যদি একবার স্মরণ করেন, বুঝতে পারবেন, অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা গঠন হয়েছে স্বাধীনতার পর। কিন্তু বাংলায় বিধানসভার বয়স দেড়শো পেরিয়েছে। বাংলার বিধানসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬২ সালে। তখন তো ‘পশ্চিমবঙ্গ’ তৈরিই হয়নি। তাই বলতে হবে ‘বাংলার বিধানসভা’। প্রথম দিনে সভা হয়েছিল শনিবার, আলিপুরের বেলভেডিয়ারে। বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থাগার সেখানে। সেদিন ছিল পয়লা ফেব্রুয়ারি। সভাপতিত্ব করেছিলেন ছোটলাট পিটার গ্রান্ট। বেলভেডিয়ার রাজভবন, টাউন হল হয়ে ১৯৩১ সাল থেকে আজকের এই বাড়িতে বিধানসভার স্থিতি।
বিপুল অর্থব্যয়ে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করতে তখনকার বহু বাঙালি এমএলএ আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, ‘‘কী প্রয়োজন এত বড় প্রাসাদের মতো বিধানসভার? ইডেন গার্ডেনের গাছতলায় বসে আমরা আলোচনা করে নিতে পারি না? আমাদের চাই মানুষের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, সংস্থান। এসব বড়লোকি চাল করে কী হবে?” সেই সময়, ১৯২৮, সালে স্বরাজ্য দলের সদস্য মহম্মদ সাদেক ইডেন গার্ডেনের গাছতলায় বসে বিধানসভার কাজ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আসলে প্রতিষ্ঠাকালে বাংলার আইনসভার অধিক্ষেত্র বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর, অসম – এসব রাজ্য নিয়ে পাঁচ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত ছিল। লোকসংখ্যা তখন ছিল আট কোটি। কিন্তু আইনসভা গঠনের দাবি ওঠে বাঙালি ভদ্র আর সুধীজনদের পক্ষ থেকে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি শিবনাথ শাস্ত্রীর কথায় বঙ্গসমাজের তখন ‘মাহেন্দ্রক্ষণ’।
বিদেশি শাসকরা তখন নেটিভদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চান। সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের চলতে হচ্ছে। বড়লাট লর্ড ডাফরিনের মতে, ইংরেজ রাজশক্তি উত্তাল সমুদ্রের চতুর্দিকের মধ্যবর্তী একটা বিচ্ছিন্ন শিলাখণ্ডর মতো তখন দাঁড়িয়েছিল। সেই সময় ব্রিটিশ শাসকরা আসলে কী চেয়েছিলেন? তাঁরা চেয়েছিলেন, যদি উচ্চবর্গের সমাজ শিরোমণি কয়েকজন ভারতীয়কে আইনসভায় মনোনীত করে নিয়ে আসা যায়, তবে নেটিভদের থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যাবে। আর তখন রাষ্ট্রশক্তিকে অনেক সংহত করে শাসিতের সম্মতি অনায়াসেই নিশ্চিত করা যাবে। বস্তুত, ঔপনিবেশিক শাসকদের আরোপিত অনেক রকমের নিয়মকানুন সেই সমস্ত সংস্কারের মধ্য দিয়েই আইনসভার বিবর্তন হয়েছে। তাতে আইনসভার কাঠামো পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু জাতীয় আন্দোলন ক্রমশ বেড়েছে বই, কমেনি।
সেই সময় বিধানসভার প্রকৃতি কী ছিল? কে ছিল তাঁর চালক? আজ ১৬৪ বছর হল বিধানসভার বয়স। সেই সময় বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়: ‘হে সর্বদ। আমাকে ধন দাও, মান দাও, যশ দাও, আমার সর্ববাসনা সিদ্ধ কর। চাকরি দাও, রাজা কর, রায়বাহাদুর কর। আমি তোমাকে প্রণাম করি।’ (লোক রহস্য)। আসলে তৎকালীন কলকাতার সমাজে যাঁরা বিধায়ক এবং সুবিধাভোগী, তাঁদের নিয়ে অনেক সমালোচনাও কিন্তু ছিল। ’৩৭ সালে যখন ভোট হয় তখন যে-মন্ত্রিসভা গঠন হয়, সেই মন্ত্রিসভাকে বলা হয়েছিল, ‘জমিদার পুষ্ট মন্ত্রিসভা’।
কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চেপে ১৯৩৭-র সেই প্রসারিত ভোটাধিকারের কাহিনির মধ্যে এসে পৌঁছলাম। বিধানসভার এই পর্বে তখন মফস্বল বাংলার প্রাধান্য নির্বাচিতদের মধ্যে অনেকে ছিলেন উকিল, অনেকে মোক্তার, অনেকে শিক্ষক, ডাক্তার, কবি, সাংবাদিক, হাকিম, মৌলানা-মৌলবি। এঁরা নিজেদের কৃষকের ‘নিজের লোক’ বলে দাবি করতেন। তবে মুখে যা-ই বলুন, সামান্য কয়েকজন ছাড়া এঁরা ছিলেন জোতদার, জমিদার, উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ। সেই সময় বিধানসভার আদিপর্ব থেকে ক্রমশ অনেক ঘটনা, অনেক পরিবর্তন। কিন্তু স্বাধীনতার আগে যে পাঁচটা দশক, সেখানে বিধায়ক যাঁরা ছিলেন, তাঁদের জন্য সোশাল মিডিয়া, টেলিভিশন ছিল না। দৈনিক খবরের কাগজই বা তখন কোথায়? সেইসব সময় বিধানসভাই ছিল এই বঙ্গসমাজের প্রধান কর্মকাণ্ডের একটা মঞ্চ। বঙ্গসমাজের ছবি পাওয়া যেত সেই সময়ের বিধায়কদের বিতর্কে। কারা ছিলেন সেই বিতর্কে? সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফজলুল হক, চিত্তরঞ্জন দাশ, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, শরৎচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নলিনাক্ষ সান্যাল, ড. বিধানচন্দ্র রায়, হাসিমুদ্দিন, আবুল হাসিম, আবদুল বারী, হেমপ্রভা মজুমদার, মণিকুন্তলা সেন, সুরাবর্দি, আজিজুল-হাসমি, হাসেন নৌসৈর, জ্যোতি বসু, বঙ্কিম মুখোপাধ্যায় – এরকম আরও কত এমএলএ।
কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডর থেকে নেমে গুটিগুটি হেঁটে বিধানসভার ভিতরে ঢুকলাম। আলাদা করে প্রেস গ্যালারি খুঁজে পেলাম না। কিন্তু খুব একটা নিরাপত্তার বাধা পেলাম না। গিয়ে দেখলাম, ‘কুইনাইনে’র স্বল্পতা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন খেয়া নৌকার ভাড়া কেন বাড়ল – তাই নিয়ে জোরদার আলোচনা! পথদুর্ঘটনা বাড়ছে। হুগলি ইমামবাড়া নিয়ে বিতর্ক। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জিনিসপত্রের দুষ্প্রাপ্যতা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, দুর্নীতি, জুয়াখেলা – এসব নিয়ে আলোচনা কিন্তু সেদিনও হত। তাতে অনেক উত্তেজনাও দেখা দিত। বিশেষ করে যখন প্রশাসনের কর্মচারী আর পুলিশের অত্যাচার সাধারণ মানুষের উপর হত। আর তা নিয়ে বিধানসভায় চিৎকার-চেঁচামেচি! শাসকদল যথেষ্টই বিরক্ত হত তাতে। ব্রিটিশ প্রভুরা সেইসব তর্কবিতর্ক খুব একটা পছন্দ করত না। এমনকী, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন থেকে বঙ্গভঙ্গ নিয়েও বিবিধ প্রশ্ন বিধানসভায় উত্থাপিত হয়েছিল। বিধানসভায় সাম্প্রদায়িক প্রশ্নও প্রাধান্য পেয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের সাধারণ সমস্যা নিয়ে বিধায়করা নানা প্রশ্ন করেছেন। সেই সময়কার বিধানসভার ধারাবিবরণী যত পড়ছি, তত মনে হচ্ছে যেন এই সেদিনকার ঘটনা। সেই একই রকমের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা বলা হচ্ছে। কী আশ্চর্য!
শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের দুর্বিষহ জীবনযাত্রা নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উত্থাপন হচ্ছে। সুরেন বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু, অম্বিকাচরণ মজুমদার, গুরুপ্রসাদ সেন – এমনকী, ভূপেনচন্দ্র বসু, যোগেশ চৌধুরীর মত মানুষ কত প্রশ্ন করছেন! পরবর্তী পর্যায়ে নীলরতন সরকার, ফজলুল হক, এমদাদুল হক রীতিমতো অনেক প্রশ্ন করার দক্ষতা দেখিয়েছেন। স্বাধীনতার পর অবশ্য উদ্বাস্তু পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পেল। খাদ্যসংকট, অনাহারে মৃত্যু, এমনকী, কমিউনিস্ট পার্টিকে যে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। বুলগানিন ক্রুশ্চেভের পশ্চিমবঙ্গ সফর, ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র নিয়ে সেই সময় বিধানসভায় আলোচনা হয়েছে। বিধান রায়কে পরিস্থিতি সামাল দিতে হত। প্রশ্নের মাধ্যমে মন্ত্রীদের বিরোধী বিধায়করা জর্জরিত করতেন।
১৮৯৬ সালের ১৪ মার্চ। বিধানসভায় আমি বসে বসে শুনছি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি প্রশ্ন। সুরেন বাঁড়ুজ্যে গরুর গাড়ির চালককে নির্দয়ভাবে কেন প্রহার করা হয়েছে – তাই নিয়ে উত্তেজিত। বর্ধমানের কাছে, মেমারিতে ঘটেছে ঘটনাটা। বর্ধমানের ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার উইলসন এক গরুর গাড়ির চালককে নির্দয়ভাবে প্রহার করেছেন। কারণ তাঁর গাড়ির গতি এই গরুর গাড়ির জন্য শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। এমন মেরেছেন যে চালকের নাক-মুখ দিয়ে প্রবল রক্তপাত! দুর্ঘটনার বিবরণ দিয়ে বর্ধমানের অমরনাথ মুখোপাধ্যায় লিখিত একটা চিঠি ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকা প্রকাশ করেছে। তাতে সুদূর মফস্বল এলাকার দরিদ্রমুখ ভারতীয় প্রজারা কীভাবে ইংরেজ রাজকর্মচারীদের দ্বারা অত্যাচারিত – তার বর্ণনা রয়েছে। সেই চিঠির ভিত্তিতে সুরেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করলেন।
আমি শুনছি।
বিধানসভা একদম পিন ড্রপ সাইলেন্স। তখন সরকারের পক্ষ থেকে জবাব দিতে উঠলেন মিস্টার হেনরি কটন। তিনি বললেন, এই ঘটনার প্রতিকার সম্বন্ধে যতটুকু করা প্রয়োজন, তাই-ই করা হয়েছে। আর কিছু করা সম্ভব নয়। উইলসন ঘটনাটি স্মরণ করতে পারেননি বলে জানানো হল। বলা হল যে, যতদূর তিনি মনে করতে পারছেন যে, একজন গরুর গাড়ির চালক ইচ্ছাকৃতভাবে পথ অবরোধ করেছিল। তাই তিনি একবার মাত্র চাবুক মেরে নিজের পথটা করে নিয়েছিলেন। তবে রক্তপাত হয়েছে – এমন কোনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে তিনি সরকারকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
এইরকম প্রশ্ন শুনছি আর ভাবছি– আজকের বিধানসভায় এই রকম প্রশ্নোত্তর হয়? না, হয় না?
সুরেন্দ্রনাথ এই প্রশ্নের পর আবার আরেকটা প্রশ্ন করছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করছেন, অষ্টম অশ্বারোহী বাহিনীর সৈন্যরা মহেশতলা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জনসাধারণের উপর নানা ধরনের অত্যাচার এবং নিগ্রহ চালিয়েছে। তাদের শাকসবজি এবং অন্যান্য ফসল জোর করে কেটে নিয়ে গিয়েছে। সরকার বাহাদুর উত্তর দিলেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যা ব্যবস্থা নিয়েছেন, সে বিষয়ে সরকার হস্তক্ষেপ করতে চান না। এরকম একের পর এক প্রশ্ন। আর বেত্রাঘাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বিভিন্ন সময় অপরাধী, এমনকী, নির্দোষ ব্যক্তিকেও, রাজনৈতিক কর্মীদেরও বেত্রাঘাত দেওয়া হত। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাত ভারতীয় এমএলএ-রা। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় বেত্রাঘাত ছিল সামান্যতম একটা শাস্তি। জেলের মধ্যেও তো বেত্রাঘাতে অনেকে আহত হয়েছেন। এমনকী, ফজলুল হক কয়েকবার রাজনৈতিক বন্দিদের বেত্রাঘাত নিয়ে প্রশ্ন করেছেন বিধানসভায়। উড়িষ্যার দুই রাজকুমারকে বেত্রাঘাত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিধানসভায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ তাঁরা ছিলেন দুই রাজকুমার। রাজবাড়ির ছেলে। আনন্দমোহন বসু প্রশ্ন করলেন যে, বেত্রাঘাতের আদেশ কার্যকর করার জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না – এটাও তিনি শুনেছেন। সিরাজগঞ্জ, আলিপুর থেকে বিচারকরা এই ধরনের অভিযোগ করছেন বলে সরকার থেকে জানানো হয়েছে। বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেওয়া হলেও বেত্রাঘাত দেবে কে? তারা তো ভারতীয়। সেইসব ভারতীয়কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেত্রাঘাতের আদেশ তারা কেউ মানতে রাজি হচ্ছে না। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, তখনই ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে অসন্তোষ কীরকমভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে কল্পনার এই সাদা অ্যাম্বাসাডরে চড়ে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ – ১০০ বছরের আগেও তার রেশ কম ছিল না। হক সাহেবের বাজারের টেন্ডার নিয়ে দুর্নীতি সে তো সেই সময়ের পত্রিকায় রীতিমতো প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ‘দুর্নীতি’ বিধানসভাতেও আলোচিত বিষয় ছিল। দেওঘরের এক মহকুমা শাসক মিস্টার হার্ড খুব ঘুষ নিতেন। এমনকী, মুরগি, ডিম, ছাগল, ভেড়া পর্যন্ত ঘুষ নিতেন। ব্যবহারের পর যেসব জিনিস অতিরিক্ত পড়ে থাকত, সেগুলো মহাশাসকের আদালতের নাজির নিলামে বিক্রি করে দিত। ‘দেশের কথা’র লেখক স্বনামধন্য সখারাম গণেশ দেউস্কর (১৮৬৯-১৯১২) ‘হিতবাদী’ পত্রিকায় মিস্টার বার্ডের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে কয়েকটা প্রবন্ধ লেখেন। সুরেন্দ্রনাথের প্রশ্ন আর সখারামের প্রবন্ধ সেসময় বিধানসভায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এমন হল যে, সরকারকে দুর্নীতি নিয়ে কমিটি গঠন করতে হয়েছিল।
ভোটের সময় বস্তিতে মদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা, এটা বেশ কয়েক দশক ধরে আমরা দেখেছি। দিল্লিতেও দেখেছি। কলকাতাতেও দেখেছি। বরং বলা যায়, আজকাল ভোটের সময় বা ভোটের আগের দিন পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে মদ্যপানের ব্যবস্থা করার রেওয়াজ অনেকটাই কমে গিয়েছে। হয়তো সোশাল মিডিয়ার দাপটে গোপনে গরিব মানুষকে টাকা আর মদ বিতরণের সুযোগ কমেছে। স্বাধীনতার আগেও মদ এবং মাদক দ্রব্য নিয়ে বিধানসভায় রীতিমতো আলোচনা হত। ১৮৯৭ ছিল দুর্ভিক্ষের বছর। তবুও সেই বছরেও সরকারি শুল্ক আদায় হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। আর আফিমেরও তখন খুব প্রচলন ছিল। গরিব মানুষের মদ্যপানে খুব উৎসাহ জোগাতেন বলে ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে। সরকারি জবাব হত, মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বেড়েছে। অত্যাধিক মদ্যপান থেকেই তো বোঝা যাচ্ছে। সুরেন বাঁড়ুজ্যে, আনন্দমোহন বসু অনেক তথ্য দিয়ে সরকারের সেই নীতির সমালোচনা করতেন। দরিদ্রপীড়িত মানুষ মদ্যপানের মাধ্যমে তাদের দুঃখ-দুর্দশা ভুলতে চাইছে বলে এমএলএ-রা অনুযোগ করতেন। এমনকী, আনন্দমোহন বসু তো একবার সরকারের প্রতি আবেদন জানালেন যে, জনগণের নৈতিক অবনতি ঘটিয়ে রাজকোষ পূর্ণ করছে। সেটা যেন তারা বন্ধ করে। ছোটনাগপুরের আদিবাসী জনগণকে সরকার অত্যন্ত সফলভাবে মাদক পণ্যের পঙ্কিল আবর্তে নিমজ্জিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
সুতরাং, গরিব মানুষকে মদ খাইয়ে শাসকদলের সচেতনতাকে রুদ্ধ করার ইতিহাস সারা পৃথিবীতেই দেখা গিয়েছে। চিনেও দেখা গিয়েছে আফিম ও মদ। পুরনো সব হলিউডের ছবিতেও, জাপান এবং চিনের ইতিহাসের পাতাতেও সেসব দেখা যায়। কিন্তু কলকাতার মদ্যপানের একটা ইতিহাস ছিল। মদের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। জর্জিয়া, ইরান, আর্মোনিয়া অঞ্চলে মদ উৎপাদন হত, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০-৬০০০ এই সময়টায়। সুতরাং, মদ খুব প্রাচীন সভ্যতা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ব্যাপার।
কিন্তু কলকাতা শহরে, ব্রিটিশ যুগে, শহরের মানুষদের মধ্যে যেরকম মদ্যপানের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল এবং সেখানেও খালাসিটোলার কাহিনি ছিল। দেশি মদের দোকানে, যেখানে খুব সস্তায় মদ পাওয়া যায় – সেখানে মানুষ দৌড়ত। এ সমস্ত ইতিহাস বেশিদিনেরও নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাতেও খালাসিটোলার কাহিনি শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, রাজা রামমোহন রায় ব্যঙ্গ করে মদ্যপানের পক্ষে বলতে গিয়ে রীতিমতো কলকাতা শহরে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। বরফের আমদানি যখন শুরু হল, তখন কলকাতায় মদ্যপানের ইতিহাসে একটা বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল! পৃথিবীতে বরফ সাপ্লাই করেছেন টিউডর সাহেব। বারবার তাঁর ব্যবসায় লালবাতি জ্বলছে। দেনার দায়ে জেলে গিয়েছেন। দেউলিয়া হয়েছেন। কিন্তু সুরারসিক কলকাতাবাসীদের তাঁকে মনে রাখতেই হবে একটাই কারণে যে, তিনি তাজা, টাটকা হিমবাহ সাপ্লাই করেছিলেন গেলাসে গেলাসে। সেই সময় ফ্রেডরিক টিউডরের বরফ সরবরাহ একসময় ৩০০০ টনে গিয়ে পৌঁছেছিল!
বিদ্যাসাগর খোদ পাশ্চাত্য সভ্যতার তিনটে অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর প্রথম দু’টি হল, ইংরেজি সাহিত্য আর পাউরুটি। কিন্তু তৃতীয়টা হচ্ছে বরফ। বরফ সংরক্ষণের অনেক কায়দা ছিল। ঘোড়ার কম্বলে মুড়ে বা কাঠের গুঁড়ো দিয়ে ঢেকে রাখা হত। যাতে সময়ে সে হিমায়ত অবস্থাতে টুকুস করে খসে পড়তে পারে সুরারসিকের গেলাসে। টিউডার কোম্পানি বরফ সাপ্লাইয়ের পাকাপাকি ব্যবসা খুলে বসলেন। ১৮৮৩ সালে কলকাতায় ‘বেঙ্গল আইস ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’ তৈরি হল, সস্তায় বরফ মদের বাজার দখল করে নিয়ে।
একদিকে শহুরে অভিজাতরা মদ্যপানের ব্যাপারে শৌখিন ছিল যেমন, ঠাকুর পরিবারের চাকরবাকরাও মদ্যপানের ব্যাপারে খুব শৌখিন ছিল। ভারী শৌখিন ছিল ছিল মেথর। বিলেতি মদ খাওয়ায় অভ্যাস ছিল। দেশি মদ সে নাকি ছুঁত না! বিলেতি মদ দেখলেই তার মুখে ফরফর করে ইংরেজি গরম গরম গালাগালি বের হয়। ‘ড্যাম ইউ রাস্কেল’ – এইসব বলত সে। ইংরেজি বুলি শুনলেই বোঝা যেত লোকটা খেয়েছে। এসব কথা জেনেছি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ গ্রন্থে। অন্যদিকে, রসরাজ অমৃতলাল বসু, শিবনাথ শাস্ত্রীরা বিলাতি কালচারকে দায়ী করেছেন, নব্যবাবুদের বাড়াবাড়ির জন্য। কিন্তু বিধানসভায় ১৯৩০-র দশকে ভোটের সময় গরিব মানুষকে মদ খাইয়ে তাদের নির্বুদ্ধিতার পথে ঠেলে দেওয়া, তার অভিযোগ তুলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতারা ব্রিটিশকে দায়ী করছেন। শিশুমৃত্যুর পাশাপাশি মদ এবং আফিম একটা মস্ত বড় ইস্যু, কিন্তু আজ শুনলে অবাক হতে হয়।