পরনে সাদা পাজামা ও নীল রঙের পাঞ্জাবি। গলায় লাল ও গেরুয়া রঙের মিশেলে উত্তরীয় জড়ানো। পোশাকের মতো তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও নানা রঙের মিশেল। এ বার নিজের এলাকাতেই তিনি বিজেপির প্রার্থী। পাড়ায় তাঁকে সকলে ‘বাবাই’ বলে চেনে। বঙ্গবাসী তাঁকে চেনে রুদ্রনীল ঘোষ বলে।
শিবপুর বিধানসভা বেশিরভাগ সময়েই ডানপন্থী মেজাজে চলে। কয়েকদশক ধরে এক ডাকে পাওয়া যেত তিনি হলেন বিধায়ক জটু লাহিড়ীকে। পাঁচবার বিধায়ক হয়েছিলেন। ২০১১ সালে জটু লাহিড়ী তৃণমূলের টিকিটে যেতেন। এর পর থেকে সেই শিবপুরে পর পর দু’বার প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল কংগ্রেস (২০২১ সালে মনোজ তিওয়ারি, ২০২৬ সালে রানা চট্টোপাধ্যায়)। প্রার্থী বদল করেছে বিজেপিও (২০২১ সালে রথিন চক্রবর্তী, ২০২৬ সালে রুদ্রনীল ঘোষ)। এ বার পাড়ার ছেলের কাঁধেই পদ্মের পতাকা। হোম গ্রাউন্ডে ম্যাচ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল? রুদ্রনীল বলছেন, ‘মানুষের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তাঁরা যন্ত্রণার কথা আমাদের বলছেন। নাগরিক পরিষেবার অসুবিধা রয়েছে কেন? সেই প্রশ্ন করলে তৃণমূলের কাউন্সিলর, বিধায়করা হুমকি দিতেন।’
‘যাঁরা তৃণমূলকে ভরসা করে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের জীবন নরক করে দেওয়া হয়েছে।’
রুদ্রনীল ঘোষ
হুগলি নদীর পাড়ে ছোট্ট শহর শিবপুর। বুকের মধ্যে আগলে রাখা সবুজ বনানী ‘বটানিক গার্ডেন’। রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলেন, এই শিবপুরের ভোটের রংও সবুজ। ২০১১ সালে পালাবদলের অনেক আগেই একাধিকবার কংগ্রেসের দখলে যায় এই বিধানসভা। যার কাণ্ডারি ছিলেন জটু লাহিড়ী। তবে শিবপুরের আনাচে-কানাচে নাগরিক পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে জনসাধারণের। সেটাকেই এককাট্টা করছেন রুদ্র। তাঁর কথায়, ‘শিবপুরের ড্রেন, পাঁক, জল, নিকাশী ব্যবস্থার অবস্থা বেহাল। জলাশয়গুলিকে অবৈধ ভাবে বুজিয়ে প্রোমোটিং করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে কর্পোরেশন বন্ধ করে মানুষের জীবন আস্তাকুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটা কোনও বিজেপি কর্মীর কথা নয়। যাঁরা তৃণমূলকে ভরসা করে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের জীবন নরক করে দেওয়া হয়েছে।’
সম্প্রতি হাওড়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বৃষ্টির মধ্যেই জমা জলে নেমে প্রচার করেছেন রুদ্রনীলকে। একই ভাবে হাওড়া পুরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডে জাতীয় সেবা দলের কাছে রাস্তায় জমে থাকা নোংরা জলে নেমে প্রচার চালিয়েছেন তিনি। জমা জল, মশা-মাছির উপদ্রব নিয়ে সরব হয়েছেন শাসকদলের বিরুদ্ধে। মজা করে বলেই ফেললেন, ‘বেলা ২টো-৩টের পর থেকে বসতে পারবেন না কোনও জায়গায়। মশা হেলিকপ্টারের মতো আপনাকে চাগিয়ে নিয়ে যাবে।’
থিয়েটার থেকে উঠে আসা রুদ্রনীল অভিনয় জগতের মানুষ। সেই থিয়েটারের হাতেখড়ি হয়েছিল শিবপুরের বাণী নিকেতন মঞ্চে। ফলত, নিজের এলাকার মানচিত্র আঁকা রয়েছে তাঁর মস্তিষ্কে। সেটা অনুসরণ করেই সকাল-বিকেল এ পাড়া, ও পাড়া ঘুরছেন বিজেপি প্রার্থী। প্রচারের ফাঁকেই একটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন গত ৯ এপ্রিল। শিবপুরে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ডব্লু রোড এলাকায় এক তৃণমূল কর্মী তাঁর সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতেই তাঁর সঙ্গে বচসা শুরু হয়। ওই তৃণমূল কর্মীকে জড়িয়ে ধরে চুমুও খান তিনি। যদিও তাঁর দাবি, ‘আমি সেই ভাইকে চুমু খেয়েছি, হামি খেয়েছি, আদর করেছি। এটা তো সৌজন্য। ভাব-ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে হবে।’
তবে শিবপুরের মানুষ কি তাঁকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবে? সেই ভালোবাসার প্রতিফলন কি মিলবে ভোটবাক্সে?
সাক্ষাৎকার: শিলাদিত্য কর