এই সময়, নয়াদিল্লি: বাংলার শাসকদল তৃণমূল দাবি করছে, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার জন্য দায়ী বিজেপি এবং দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আবার বিজেপির দাবি, ‘সার’ প্রক্রিয়ায় বাদ গিয়েছে অনুপ্রবেশকারীদের নাম। এই ‘সার’–এর শেষ পর্যায়ে ‘অ্যাজুডিকেশন’–এর মাধ্যমে যে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের এ বার ভোটাধিকার থাকবে কি না, তা নিয়েই এই মুহূর্তে চলছে যাবতীয় জল্পনা। এর জন্য রাজ্য প্রশাসন ও কমিশন— উভয়ের টানাপড়েনকেই দায়ী করল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার সকালে ‘সার’–এর ‘অ্যাজুডিকেশনে’ বাদ পড়া ভোটারদের নাম তালিকায় রাখার জন্য একটি আবেদনের উপরে শুনানি চলছিল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে। সেখানে আদালতের যুক্তি, বাংলায় ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকাভুক্ত ভোটাররা রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দ্বৈরথের মাঝে পুরো ‘স্যান্ডউইচ’ হয়ে গিয়েছেন৷ এই মুহূর্তে বাংলায় দু’দফার ভোটের জন্যই ভোটার তালিকা ফ্রিজ় হয়ে গিয়েছে। ফলে এই ভোটারদের কেউ এ বার বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না, তার সদুত্তর এ দিন দীর্ঘ শুনানির পরেও স্পষ্ট হয়নি।
সিজেআই কান্ত শুনানির শেষে জানিয়ে দেন, ফ্রিজ় হয়ে যাওয়া ভোটার তালিকায় যদি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা কোনও ভোটারের নাম যুক্ত করা হয়, তা হলে ইতিমধ্যে নাম উঠে যাওয়া ভোটারদের ভোটাধিকারের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। আবার বিচারপতি বাগচী জানান, এই আবহে ভারতীয় সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে (ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের ব্যতিক্রমী ক্ষমতা প্রয়োগের এক্তিয়ার) বর্ণিত ক্ষমতা শীর্ষ আদালত প্রয়োগ করতে পারে কি না, তা আগামী দিনে দেখা হবে। এই অবস্থায় এ দিনের শুনানি শেষ হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের লিস্টিং অনুযায়ী, বাংলার ‘সার’ সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত রয়েছে ২৮ এপ্রিল। ততদিনে প্রথম পর্যায়ের ভোট শেষ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় দফার ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। ফলে এই বাদ পড়া ভোটারদের যে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকছে না, তা একরকম নিশ্চিত হয়ে গেল বলেই আইনজীবীদের বড় অংশ মনে করছেন।
‘অ্যাজুডিকেশনে’ বাদ পড়া প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে যাঁদের অন্তত আধার কার্ড ও পাসপোর্ট দু’টিই আছে, তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানিয়ে একটি আলাদা মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। এ দিন সকালে সিজেআই কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে প্রথমে এই মামলার শুনানি হয়। সেখানে মামলাকারীর তরফে এও বলা হয় যে, ট্রাইব্যুনালে লক্ষ লক্ষ আবেদন জমা পড়লেও তার শুনানি শুরু হয়নি। ফলে এই ভোটারদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিচারপতি বাগচী কমিশনের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, বিহারে বা অন্য রাজ্যে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ তালিকায় এত লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম তো বাদ যায়নি, তা হলে এ রাজ্যে কেন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। সে সময়ে কমিশনের আইনজীবী ডি শেষাদ্রি নাইডু যুক্তি দেন, রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী না–দেওয়াতেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাতে বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘এটা রাজ্য এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনও লড়াই নয়। এটা দোষারোপের খেলাও নয়। এখানে দু’টি সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের মাঝে ভোটাররা স্যান্ডউইচ হয়ে গিয়েছেন৷’ যদিও ট্রাইব্যুনাল কী ভাবে, কতদিনে এই ভোটারদের আবেদনের নিষ্পত্তি করবে, তার জন্য ট্রাইব্যুনালের উপরে কোনও চাপ দেওয়া যায় না বলেও জানিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
মামলাকারীর আইনজীবী রউফ রহিমের সওয়াল, পাসপোর্টধারী ভোটার হওয়া সত্ত্বেও ‘অ্যাজুডিকেশনে’ প্রচুর লোকের নাম বাদ পড়েছে৷ ট্রাইব্যুনালে তাঁদের আবেদন শোনা হচ্ছে না৷ সে কথা শুনে প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, ‘হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমাকে জানিয়েছেন আজ সকাল থেকে ট্রাইব্যুনালে শুনানি শুরু হয়েছে। ট্রাইব্যুনালকে এ ভাবে ব্ল্যাকমেল করা যাবে না। আমরা কোনও সিদ্ধান্ত নেব না, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ট্রাইব্যুনালই নেবে।’
এর আগে গত সপ্তাহের শুনানিতে দেশের শীর্ষ আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল, ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাইবুনালে আবেদনকারী বাংলার ভোটারদের ভোটদানের বিষয়টি তাঁরা বিবেচনা করে দেখবেন৷ সেই আশ্বাসের নিরিখে কিন্তু এ দিনের সুপ্রিম শুনানিতে কোনও সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা মেলেনি বলেই মনে করছেন আইনজীবী মহলের একটা বড় অংশ৷
এ দিনের শুনানিতে আরও একটি পরিসংখ্যান নিয়েও আইনজীবীরা ধন্দে রয়েছেন। এ দিন শীর্ষ আদালত জানায়, কলকাতা হাইকোর্টের তরফে একটি রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে, এখনও পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালগুলিতে সব মিলিয়ে ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৭৪ জন ভোটারের আবেদন জমা পড়েছে। অথচ কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গোটা রাজ্যে ‘অ্যাজুডিকেশন’ পর্বে সব মিলিয়ে ২৭ লক্ষের মতো ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। আর ‘সার’–এর শুরু থেকে এখনও সব মিলিয়ে বাদ গিয়েছে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, শুধুমাত্র ‘অ্যাজুডিকেশনে’ যাঁদের নাম জুডিশিয়াল অফিসাররা খারিজ করেছেন, তাঁরাই ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ২৭ লক্ষের কিছু বেশি ভোটারই ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে পারেন। তা হলে এই ৩৪ লক্ষ ভোটারের আবেদন কী ভাবে ট্রাইব্যুনালে জমা পড়ল, প্রশ্ন তা নিয়েই।
এ দিন দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার ‘সার’ সংক্রান্ত মূল মামলার শুনানি চলছিল। সেখানে রাজ্য সরকারের তরফে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর্জি জানান, ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক৷ কল্যাণের কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আজ সুপ্রিম কোর্টের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রয়োজনে ২০ বা ২১ এপ্রিল চূড়ান্ত সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারী ভোটারদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক৷’ এ প্রসঙ্গেই উঠে আসে ভোটার তালিকা ফ্রিজ় হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। কল্যাণের এই আর্জি খারিজ করেন প্রধান বিচারপতি৷ নিজের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, ‘সেই প্রশ্নই ওঠে না। ফ্রিজ় হওয়া তালিকার ভিত্তিতেই করতে হবে ভোটগ্রহণ৷ যদি আমরা এটা অনুমতি দিই, তা হলে যাঁদের নাম ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকায় রয়েছে, তাঁদের ভোটাধিকারও স্থগিত করতে হবে৷’ আবার বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেন, ৯ এপ্রিল (বাংলায় দ্বিতীয় দফার ভোটার লিস্ট ফ্রিজ় হওয়ার দিন) বা তার ঠিক পরেই যদি কোনও আপিলের নিষ্পত্তি হয়, তবেই সেই ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকে, যা আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। আবার, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান দাবি করেন, যাঁদের নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় ছিল, তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
এই প্রসঙ্গেই দিওয়ানের দাবি, প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালে ক্লিয়ার হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে আবার সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করুক নির্বাচন কমিশন৷ এই আর্জিও মান্যতা পায়নি সুপ্রিম কোর্টে৷ আদালতের মতে, এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব নয়, যাতে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের উপরে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। যদিও এ দিন শুনানির একেবারে শেষ পর্বে বিচারপতি বাগচী কমিশনের কাছে জানতে চান, সর্বশেষ ভোটের কতদিন আগে তালিকায় নাম সংযুক্ত করা যেতে পারে, তা কমিশন হলফনামা দিয়ে জানাক। নিজের পর্যবেক্ষণে বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমরা আর্টিকল ১৪২ প্রয়োগ করার কথা ভাবব৷’ এটা হলো ভারতীয় সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদ, যেখানে দেশের শীর্ষ আদালত নিজের ক্ষমতাবলে প্রয়োজনমাফিক যে কোনও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে৷ এই ধারা অনুযায়ী গৃহীত সিদ্ধান্তই মান্যতা পাবে গোটা দেশে৷ বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, ‘কেউ যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই দেশে ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু সাংবিধানিকই নয়, এটি আবেগের বিষয়ও বটে।’