বাংলার ভোটে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের সুপ্রিম ইঙ্গিত
বর্তমান | ১৪ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: প্রয়োজন হলে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অস্ত্র করে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে সুপ্রিম কোর্ট। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলার শুনানিতে সোমবার এই ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করল শীর্ষ আদালত। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ হল সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকা এক বিশেষ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে যে কোনো বিচারাধীন মামলার ‘সম্পূর্ণ বিচার’ (Complete Justice) নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যে কোনো আদেশ বা ডিক্রি জারি করতে পারে সর্বোচ্চ আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্যে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু চুপ করে যান। একইসঙ্গে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চের মন্তব্য, ‘যদি কোনো কেন্দ্রে ১৫ শতাংশ ম্যাপড ভোটার বৈধ হয়েও ভোট দিতে না পারেন এবং শেষে দেখা যায়, ওই কেন্দ্রে জয়ের মার্জিন ২ শতাংশ, তাহলে তা সেখানকার ভোট বাতিলের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনই কিছু বলছি না। আগে ট্রাইবুনাল ঠিক করে কাজ শুরু করুক।’ মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিরা ট্রাইবুনালে ‘আবেদন’ করলেই এবার ভোট দিতে পারবেন না। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাইবুনালে ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৭৪টি আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ অ্যাডজুডিকেশনে বাদ পড়া ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের পাশাপাশি আগে যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল, তাঁদেরও একাংশ আরজি জানিয়েছে ট্রাইবুনালে। যদিও ১৯টি ট্রাইবুনাল কাউকে ভোটার হিসাবে ছাড়পত্র দিলে কী হবে, এদিনও তা স্পষ্ট করেনি প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। পরবর্তী শুনানি ২৮ এপ্রিল। ততদিনে প্রথম দফার ভোট হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় দফার নির্বাচনও থাকবে ঠিক তার পরদিন। অর্থাৎ, ২৯ এপ্রিল। সেক্ষেত্রে একটা বিষয় নিশ্চিত, ট্রাইবুনালে আবেদনের পর যাঁরা বৈধ হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছেন, তাঁরা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না।
তবে ‘সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট’ বের করা যায় কি না, বিষয়টি তাঁদের মাথায় আছে বলেই শুনানির পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছেন বিচারপতি বাগচী। যদিও কমিশনের আইনজীবী বারবার বলেন, ‘মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষদিন পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ভোটাররাই ভোটদানের যোগ্য।’ পালটা সওয়াল করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। বলেন, ‘যদি ভোটের আগে এসআইআর প্রক্রিয়াই শেষ না হয়, তাহলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারা মোতাবেক পুরানো ভোটার তালিকাতেই ভোটদান হওয়ার কথা।’ তাই ভোটের আগে পর্যন্ত ট্রাইবুনাল যত নামে ছাড়পত্র দেবে, সেগুলি এবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আরজি জানান তিনি।
আবেদনকারীদের অন্যতম আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রথম দফার ভোটের জন্য গত ৬ এপ্রিল ভোটার তালিকা ফ্রিজ হয়েছে। সেখানে রঘুনাথগঞ্জের একটি বুথের সব ভোটারই বিবেচনাধীন। এমন আরও আছে।’ তখনই বিচারপতি বাগচী জানান, ‘৬ এপ্রিল তালিকা ফ্রিজ হয়েছে ঠিকই। তবে বিচারকদের সই না হওয়ার মতো কিছু টেকনিকাল কারণে যাঁদের নাম ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ছাড়পত্র পেয়েছে, তাঁরাও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, ‘হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমাদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম বিবেচনাধীন ছিল। নিষ্পত্তি বাকি আছে স্রেফ ১ হাজার ৮২৩ জনের।’
অন্যদিকে, বৈধ পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও একই পরিবারের ১৩ জনের মামলার শুনানিতে আইনজীবী রউফ রহিমের আবেদনে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, ট্রাইবুনালে যান। যদিও দ্রুত বিচার করতে ট্রাইবুনালকে কোনো চাপ দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। কমিশনের আইনজীবী দাবি করেন, ‘রাজ্য পর্যাপ্ত অফিসার দেয়নি বলেই নিষ্পত্তিতে দেরি।’ তখনই বিচারপতি বাগচীর খোঁচা, ‘কমিশন আর রাজ্যের মতানৈক্যের মাঝে সাধারণ ভোটাররা স্যান্ডউইচ হচ্ছে। তাছাড়া এতা রাজ্যে এসআইআর হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গেই কেন লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি? আপনারা তো বলেছিলেন ২০০২ সালের এসআইআরে নাম থাকলে নথি দাখিল করতে হবে না। তারপরও তো নাম বিচারাধীন হয়েছে। এভাবে কমিশন তো তাদের জারি করা নির্দেশিকা থেকেই সরে এসেছে।’