কলকাতা কি যুদ্ধক্ষেত্র? ৭৫ শতাংশ বুথই অতি স্পর্শকাতর
বর্তমান | ১৪ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় শহরের ৭৫ শতাংশ বুথই ‘অতি স্পর্শকাতর’! সোমবার কমিশন থেকে পাওয়া তথ্যে তেমনটাই জানা গিয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রের ১০০ শতাংশ বুথই ‘অতি স্পর্শকাতর’ তালিকাভুক্ত হয়েছে। উত্তর কলকাতার ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ। এসব বুথে হবে ওয়েব কাস্টিং। মোতায়েন থাকবে আধা সামরিক বাহিনী। ১২-১৫টি, খুব বেশি হলে ২০-২২টি বুথের জন্য একটি করে কুইক রেসপন্স টিম থাকবে। কমিশনের এই বিপুল আয়োজনে শহরবাসীদের মধ্যে একটাই প্রশ্ন, কলকাতা কি যুদ্ধক্ষেত্র? এটা ভোট চলছে নাকি যুদ্ধ?
‘সুপার সেনসিটিভ’ বা ‘অতি স্পর্শকাতর’ বুথের সংজ্ঞা কী? কমিশন জানাচ্ছে, যে বুথে কমপক্ষে ১৫০ জন ভোটারের নাম এসআইআরে বাদ গিয়েছে, সেই বুথকে এবার ‘অতি স্পর্শকাতর’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এদিন উত্তর কলকাতার ডিস্ট্রিক্ট ইলেকশন অফিসার (ডিইও) স্মিতা পান্ডের তরফে সাংবাদিক বৈঠক করা হয়। উপস্থিত ছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা সহ আধা সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তারা। সেখানেই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। স্মিতা পান্ডে বলেন, ‘যেসব বুথে একসঙ্গে বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ থাকতে পারে। তাছাড়া, এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এই ধরনের বুথ চূড়ান্ত করা হয়েছে। কলকাতা উত্তরের সাতটি বিধানসভার মোট ৫৮৩টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে রয়েছে ১,৮৩৫টি বুথ। তার মধ্যে ২৬৪টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের ৮৩৭টি বুথকে ‘অতি স্পর্শকাতর’ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা কলকাতা উত্তরের মোট বুথের ৪৮ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেক। উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে সব থেকে বেশি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র ‘অতি স্পর্শকাতর’ বলে ধরা হয়েছে। সেখানকার ১৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮০টিই ‘সুপার সেনসিটিভ’। চৌরঙ্গি বিধানসভার ২২২টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের মধ্যে ৬০টি, এন্টালির ৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ২২টি, বেলেঘাটার ১১৭টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩২টি, জোড়াসাঁকোতে ৭৩টির মধ্যে ১৪টি, মানিকতলার ৪০টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের ১৩টি এবং কাশীপুর-বেলগাছিয়ায় ১৪৫টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৮টি এই তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরপরও সংখ্যাটা বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কমিশন।
দক্ষিণ কলকাতার ডিইও রণধীর কুমার জানিয়েছেন, এখানকার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রের সব বুথই ‘সুপার সেনসিটিভ’। অর্থাৎ ভবানীপুর, কলকাতা বন্দর, রাসবিহারী ও বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের ১০০ শতাংশ বুথই ‘অতি স্পর্শকাতর’। ডিইও’র বার্তা, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তার জন্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে আট দফা কর্মসূচি। ২০১৬ ও ২০২১ সালে যে অভিযোগ এসেছিল, সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেসব জায়গায় নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। কলকাতায় এখনও পর্যন্ত ৯৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। তার মধ্যে শুধুমাত্র দক্ষিণ কলকাতাতেই রয়েছে ৫৩ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। যদিও এখানে বিধানসভার সংখ্যা উত্তরের চেয়ে কম।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘ওরা ভুলে যাচ্ছে, এর আগে ২ লক্ষ আধা সামরিক বাহিনী নামিয়েও নির্বাচন কমিশন বিজেপিকে জেতাতে পারেনি। এবার আড়াই লক্ষ নামিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কোনো নির্বাচনেই উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতায় কোনো অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। নির্বাচন কমিশন এসব করে বিজেপির বক্তব্যেই সিলমোহর দেওয়ার চেষ্টা করছে। আসলে হেরে যাবে বলেই কমিশনের ছাতার তলায় বসে এসব করছে বিজেপি।’
এদিকে, দাগি আসামিদের তালিকা ইতিমধ্যে কমিশনের হাতে পৌঁছে দিয়েছে লালবাজার। সাংবাদিক বৈঠকে এদিন ডিইও (দক্ষিণ কলকাতা) জানিয়েছেন, ৫০০ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর বকেয়া ছিল। ৬৮১টি নতুন ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। পাশাপাশি, ফেরার দুষ্কৃতী সোনা পাপ্পুর বিষয়টিও নজরে রেখেছে কমিশন। এখনও পর্যন্ত ৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৩টি কার্তুজ বাজেয়াপ্ত হয়েছে শহর থেকে। গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামের ফলাফল ঘোষণার সময় লোডশেডিং নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। সেই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে বদ্ধপরিকর কমিশন। তাই গণনাকেন্দ্রের জন্য অত্যাধুনিক জেনারেটের আনা হয়েছে। পাওয়ার ব্যাক-আপ থাকবে। সিইএসসি থেকে বিদ্যুৎসংযোগ নেওয়া হয়েছে। লোডশেডিং হবে না বলেই দাবি করেছে কমিশন।