সাড়ে তিনশো দিন ডুবে থাকে গভীর জলে, চৈত্র সংক্রান্তিতে ভেসে ওঠে চড়ক গাছ
বর্তমান | ১৪ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বছরের ৩৫০ দিন ডুবে থাকে গভীর জলের নীচে। ভক্তদের বিশ্বাস, চৈত্র সংক্রান্তির আগে অলৌকিকভাবে ভেসে ওঠে। তখন সেটিকে পুজো করতে হয়। পুজো করার পর সে ‘চড়ক গাছ’ পোঁতা হয় মাটিতে। তারপর সন্ন্যাসীরা তাতে কাছি বেঁধে মাটি থেকে ত্রিশ-চল্লিশ ফুট উপরে বনবন করে ঘোরেন। চড়ক পুজোর সময় এ গাছই হয়ে ওঠে নায়ক।
সন্ন্যাসীরা বটেই গোটা বাংলার কাছে চড়ক গাছ অতি পবিত্র। আজ চৈত্র সংক্রান্তি। চড়ক পুজো চলছে রাজ্যের সর্বত্র। কলকাতার বিডন স্ট্রিটে ছাতুবাবুর বাজারেও হচ্ছে চড়ক। দুপুর গড়ানোর পর সেখানে ৩৪ ফুট উঁচু চড়ক গাছ আঁকড়ে সন্ন্যাসীরা আকাশে ঘুরতে শুরু করবেন। দেখতে ভিড় করবেন হাজার হাজার মানুষ। সে উপলক্ষ্যে বিডন স্ট্রিটজুড়ে মেলা বসেছে, চলবে সারারাত। আলিপুরদুয়ার থেকে চন্দননগর, কৃষ্ণনগর থেকে বাঁকুড়া, বনগাঁ থেকে সুন্দরবন, বিভিন্ন এলাকার লোকশিল্প এবং গৃহস্থালী সামগ্রী নিয়ে দোকানদাররা বিডন স্ট্রিটে আসেন। কলকাতার বাসিন্দারা ভিড় করে যান কিনতে।
বাংলার বহু মানুষের বিশ্বাস, চড়ক গাছের মধ্যে দেবতার শক্তি ভর করে। তাই সে গাছ জল থেকে তোলার আগে অনুমতি চেয়ে পুজো করতে হয়। নইলে অমঙ্গল হতে পারে। লোকশ্রুতি, চড়ক পুজোর আগের রাতে গাছের চারপাশে অলৌকিক শব্দ শোনা যায়। খেলা করে আলো-ছায়া। এভাবে দেবতা তাঁর উপস্থিতির ইঙ্গিত দেন। প্রচলিত লোককথা, একদা এক ভক্ত চড়ক গাছে ঝুলে তপস্যা করার সময় মৃত্যুর মুখে পড়েন। শিব স্বয়ং এসে তাঁকে জীবন দান করেন। তখন থেকে বিশ্বাস, ভক্তিভরে পুজো করলে দেবতা সর্বদা, সর্বত্র রক্ষা করেন। গ্রামাঞ্চলের আরও বিশ্বাস, চড়ক গাছের নীচে পড়া রক্ত উর্বর করে মাটি। এই বিশ্বাস থেকেই কৃষকরা এই আচারকে গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন প্রবহমাণ কাল। এই ক’দিন ছাতুবাবুর বাজার আলোয় ভরে যায়। লোকে লোকারণ্য। অনাথনাথ দেব ট্রাস্ট অ্যান্ড স্টেট ছাতুবাবুর চড়ক অনুষ্ঠানের পরিচালনা করে। দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে অনাথবাবু বাজার ব্যবসায়ী সমিতি। বাজার কমিটির সম্পাদক পঙ্কজ ঘোষ বলেন, ‘পাতিপুকুর বসাকবাগানের কাছে একটি পুকুরে বছরভর ডুবে থাকে চড়ক গাছ। এ সময় তোলা হয়।’ প্রৌঢ় তারক বিশ্বাস বহুকাল ধরে সন্ন্যাসী হচ্ছেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারি ছিলেন। অন্তরাত্মার টানে সন্ন্যাসী হয়েছেন। বিডন স্ট্রিটের চড়ক বা গাজন উৎসব আজকের নয়।
কোম্পানি বাগানে প্রথম চড়ক ও গাজন শুরু হয়েছিল। তারপর উৎসব উঠে আসে এই রাস্তায় রামদুলাল দে সরকারের জমিতে। সেখানে তখন ছোট হাট বসত। চড়কের সময় বিপুল জনসমাগম হত। তারপর বাজার তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। বাজার নির্মাণ শুরু হয় ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে। এই সাল ধরে হিসেব করে দেখলে কলকাতার এই চড়ক উৎসব দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে হয়ে চলেছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে গিরিশ পার্কের কাছেই বিডন স্ট্রিট। সে রাস্তায় ঢোকার মুখেই ছাতুবাবুর বাজার। সেখানেই হচ্ছে চড়ক উৎসব। ফাইল চিত্র