নিতাই রক্ষিত
রঙের পোঁচ যে ঠিক কবে পড়েছে, তা দেখে বোঝার জো নেই। ভোট এলেও বাড়িটা কিন্তু খানিক সুনসান। কেশপুরের (Keshpur Assembly constituency) জামসেদ আলি ভবন। পার্টি অফিসের সামনে কয়েকটি লাল ঝান্ডা থাকলেও গোটা কেশপুর জুড়ে সিপিএমের লাল ঝান্ডা খুব কমই চোখে পড়ছে। তবে কেশপুরে হারানো মাটি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা কিন্তু ছাড়েনি সিপিএম। অন্তত লাল শিবির সে কথাই বলছে। তবে কার্যালয়ের উঠোনের জীর্ণ অবস্থা দেখলেই বোঝা যাবে লোকজনের আনাগোনা অত্যন্ত কম।
কাট টু ২০০১। গমগমে পার্টি অফিস। ভোটের সময়ে সকাল বিকাল মুড়ি, আলুর চপ, মুগের জিলিপি পার্টি অফিসে সাপ্লাই দিয়ে শেষ করতে পারছেন না স্থানীয় দোকানিরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিরোধী দলের দাপুটে নেত্রী। সেই সময়ে বলেছিলেন, কেশপুর ‘সিপিএমের শেষপুর’।
এর পরে আরও ১৫ বছর কেশপুর ছিল সিপিএমের দখলেই। ২০১১ সালে যে বার বাংলার বাম-গড় ভেঙে ঘাসফুল ফুটল, সে বারও কেশপুরে জিতেছিল সিপিএম। রামেশ্বর দোলুই দ্বিতীয় বারের জন্য বিধায়ক হয়েছিলেন। ২০১৬ সালে প্রথম বার তৃণমূল জেতে কেশপুরে। এর পরে যত বার ভোট হয়েছে, ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে সিপিএমের ভোটের শতাংশও।
২০০১ সালেই দলের প্রার্থী নন্দরানি ডল জিতেছিলেন প্রায় ১ লক্ষ ৮ হাজার ভোটে। রেকর্ড মার্জিন। আর সেই কেশপুরে ২০২১-এ কেশপুরে সিপিএমের ভোটে ছিল ৬ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪-এর ঘাটাল লোকসভা নির্বাচনে কেশপুর বিধানসভা থেকে সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট এসে দাঁড়ায় ৪ শতাংশের আশেপাশে।
আজও কেশপুরের বিভিন্ন জায়গায় কান পাতলেই শোনা যায়, একটা সময়ে সিপিএমের দাপটে টেকা দায় ছিল। সেই সময়ে সিপিএমের বিরোধিতা করলেই ভয়ঙ্কর ভাবে হেনস্থার শিকার হতে হতো। খুন, ঘরবাড়ি লুটপাট, বাড়িতে আগুন ধরানো, ফসল কাটতে না দেওয়া, পুকুরে স্নান করতে না দেওয়ার মতো অভিযোগ ছিল। মোদ্দা কথা, কেশপুরে বিরোধী স্বরের কোনও জায়গা ছিল না বাম আমলে, অন্তত তেমনটাই অভিযোগ। যদিও ২০১৬ সালের পর থেকেও কেশপুরে বিরোধী স্বরের জায়গা কতটা, তা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে অনেকেরই।
২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও কেশপুর ছিল সিপিএমেরই। ২০১১ সালে সিপিএম প্রার্থী রামেশ্বর দোলুই প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের ভোট কমে দাঁড়ায় প্রায় ২২ শতাংশে। সিপিএম প্রার্থী রামেশ্বর দোলুই হেরে যান তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহার কাছে। ২০২১ এর নির্বাচনে সেই ভোট আরও কমে গিয়ে সিপিএমের ভোট দিয়ে দাঁড়ায় ৬ শতাংশে। সিপিএম সে বছর বিজেপির থেকেও পিছনে গিয়ে তৃতীয় স্থানে দাঁড়ায়। সে বারও রামেশ্বরই ছিলেন প্রার্থী।
রামেশ্বর দোলুই এখন অসুস্থ। এক সময়ের দাপুটে নেত্রী নন্দরানি ডলও বার্ধক্যজনিত কারণে দলের কাজে আর থাকতে পারেন না। আর দাপুটে কয়েক জন নেতা এখন বিজেপিতে।
যদিও ২০১৬ থেকে তৃণমূলের বিরুদ্ধেও সেই অভিযোগই তুলছে সিপিএম। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেশপুর থেকে সিপিএমের প্রার্থী হয়েছেন গুরুপদ মণ্ডল। কেশপুরে হারানো সিপিএমের ভোট পুনরুদ্ধারের জন্য এলাকায় এলাকায় নিয়মিত প্রচার করছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘প্রচারে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, মানুষ বামপন্থীদের কাছে এসে নানা রকম অভাব অভিযোগ, সমস্যার কথা বলছেন।’
কিন্তু ভোটবাক্সে কেন সিপিএম তেমন সাড়া পাচ্ছে না? গুরুপদর দাবি, ‘তৃণমূল বেশ কিছু জায়গায় প্রচারে বাধা সৃষ্টি করছে। কয়েক দিন আগে কেশপুরের ১১ নম্বর অঞ্চলের ছুতারগ্যাড়াতে প্রচারের সময়ে তৃণমূলের লোকেরা এসে বাধা দেয়। ২০১১ সালের পর থেকে তৃণমূল কী ভাবে ভোট করছে, সেটা সবারই জানা। পুলিশ প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ভোট করছে। সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারছেন না।’
যদিও তৃণমূলের দাবি, সিপিএম এই কেশপুরের বুকে কী করেছে সকলের জানা। এক সময়ে ওদের ভয় পেত মানুষ, এখন আর পায় না। তারই প্রতিফলন ভোটের ফলেও পড়ে।