তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নানা সময়ে অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে তাঁদের পরিবারকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। বার বার নিশানা করা হয়েছে তাঁর স্ত্রী, সন্তান এবং মা-বাবাকে। এ বার ভোটের প্রচারেও গত কয়েক দিন ধরে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তাঁর দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। মঙ্গলবার একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আবার সে বিষয়টি নিয়েই চর্চা শুরু হয়েছে।
ঝাড়খণ্ড থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢুকতে পারে পশ্চিমবঙ্গে। টাকা আসতে পারে বিহার এবং নেপাল থেকেও। সেই সূত্রে তৃণমূলের একেবারে শীর্ষস্তরের নেতা-মন্ত্রী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও তল্লাশি করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পুলিশ পর্যবেক্ষক-সহ বিভিন্ন আধিকারিকদের নির্বাচন কমিশন এই নির্দেশ পাঠিয়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল। এই মর্মে দু’টি স্ক্রিনশটও তৃণমূলের তরফে শেয়ার করা হয়েছে। তার সত্যতা এই সময় যাচাই করেনি।
বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে তৃণমূল। মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এ রকম নির্লজ্জ লেঠেল বাহিনী আর কোথায় দেখা গিয়েছে? বিজেপির যাঁরা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পান, তাঁদের তল্লাশি হোক। অমিত শাহের যাতায়াতেও তল্লাশি হোক। হেলিকপ্টারও চেক করা হোক। যাঁরা বাইরে থেকে এ রাজ্যে ঢুকছেন, তাঁদের কেন তল্লাশি হবে না? তৃণমূলের লোকেদের গাড়িতে তল্লাশি করে কিছু হবে না। কিছু পাওয়া যাবে না।’ এই বিষয়ে এই সময় অনলাইন কমিশনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তাদের তরফে কোনও বিবৃতি মেলেনি।
তৃণমূলের অভিযোগ, দলীয় নেতাদের নিশানা করতেই হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন আধিকারিকদের বার্তা পাঠাচ্ছে কমিশন। পুলিশ-সহ অন্যান্য পর্যবেক্ষক এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকদের নির্দেশ পাঠিয়ে তৃণমূলের নেতানেত্রী এবং তাঁদের পরিবারের লোকেদের নজরে রাখতে বলা হচ্ছে। যদিও এই বার্তা কে পাঠিয়েছেন, ঠিক কোন ব্যক্তিকে বা কোন গ্রুপে পাঠানো হচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। কবে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে, স্পষ্ট নয় তা-ও।
প্রথম স্ক্রিনশটটিতে যে ‘ফরওয়ার্ডেড মেসেজ’টি রয়েছে, সেটির শুরুতেই লেখা, ‘For all police observers and Expenditure Observers’। বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, সমস্ত পুলিশ এবং এক্সপেন্ডিচার অবর্জারভারদের জন্য। এর থেকেই অনুমান, পুলিশ এবং এক্সপেন্ডিচার পর্যবেক্ষকদের জন্য তৈরি কোনও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে। স্ক্রিনশটে দেখা গিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা লেখা, ‘গতকাল মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে তহবিল বণ্টন শুরু হয়েছে সমস্ত আউটরিচ লোকেশনে। পূর্বঘোষিত কোনও রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা না হলেও, নদিয়া, বসিরহাট, বনগাঁ, ক্যানিং, তেহট্ট, রানাঘাট, কাকদ্বীপ, মগরাহাট ২, ডায়মন্ড হারবার ১ ও ২ ব্লক এবং সেই সঙ্গে ডায়মন্ড হারবারের ফলতা ব্লক এবং লালবাগ মহকুমায় রুটিন ক্যাম্প চালু রয়েছে। এই সমস্ত ক্যাম্পে অবশ্যই তল্লাশি চালাতে হবে।’ এর পরেই লেখা, ‘জানা গিয়েছে, আজ থেকে দিনের বেলা ঝাড়খণ্ড থেকে পুরুলিয়ার মানবাজার ও বান্দোয়ান হয়ে, বিহারের পূর্ণিয়া থেকে এবং নেপাল থেকে ইসলামপুর হয়ে প্রচুর পরিমাণে নগদ টাকা (ক্যাশ) ঢুকবে।’
প্রকাশ্যে আসা দ্বিতীয় স্ক্রিনশটে আগের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তারই পরবর্তী অংশ রয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘উদ্বেগের বিষয়টি হলো, অর্থের আদান-প্রদানে অভিষেকের স্ত্রী জড়িত থাকতে পারেন। তাই আজ এই সমস্ত তল্লাশি অভিযানেই এফএসটি-কে যুক্ত করুন। তাদের যথাযথভাবে নির্দেশ দিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীকে বাদ রেখে, নিরাপত্তা পাওয়া ব্যক্তি তৃণমূলের সমস্ত নেতা-মন্ত্রী এবং অভিষেক ও তাঁর স্ত্রীকেও তল্লাশির আওতায় আনতে হবে। এফএসটি-দের আজ অতিরিক্ত দুই সেকশন সিএপিএফ এবং একজন এসি দেওয়া হতে পারে। এই বিষয়টির তদারকি করবেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ পর্যবেক্ষক। এক্সপেন্ডিচার পর্যবেক্ষকেরা এই কাজে পুলিশ পর্যবেক্ষকদের সাহায্য করেন। এই তল্লাশিতে তাঁদের একটি দল হিসেবেই কাজ করতে হবে। এই সমস্ত তল্লাশি কন্ট্রোল রুম থেকে নজরদারি করতে হবে। আমরাও সিইও-র কন্ট্রোল রুম থেকে এই তল্লাশিতে নজর রাখব। ভবিষ্যতে এই ধরনের তল্লাশি অভিযান ঘনঘন হবে।’
যদিও একবারও অভিষেক নামের পাশে কোনও পদবি ব্যবহার করা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, একবার লেখা হয়েছে ‘Abhishek’। আর একবার লেখা হয়েছে ‘Avishek’। ফলে এই অভিষেক নামক ব্যক্তি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই কি না, তা স্ক্রিনশট থেকে স্পষ্ট নয়। তৃণমূলের প্রশ্ন, টাকা যদি বাইরের রাজ্য থেকেই আসে, তা হলে সেখানেই কেন আটকে দেওয়া হচ্ছে না? কেন ঝাড়খণ্ড বা বিহারে আটকানো হচ্ছে না টাকার গাড়ি? কেন বাংলায় প্রবেশের জন্যই অপেক্ষা করা হচ্ছে?