যত কাণ্ড জয়পুরে! ভোটের আগেও। আর ভোটপর্বেও। ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর। এই জয়পুর বিধানসভার বর্তমানে ঝালদা ২ নম্বর ব্লকের কোটশিলার তাহেরবেড়া গ্রাম সংলগ্ন অস্থি পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে জীবাশ্ম রয়েছে, তাকে ‘ডাইনোসরের জীবাশ্ম’ বলে দাবি করেন আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রভাতরঞ্জন সরকার। তারপর ওই পাহাড়কে ঘিরে কৌতূহল তুঙ্গে আজও।
প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মধ্যরাতে এই কোটশিলা থানার খটঙ্গা, বেলামু, মারামুতে অস্ত্রবর্ষণ হয়। একটি বিমান থেকে এই এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল গুলি-বারুদ-আগ্নেয়াস্ত্র। তার প্রায় ৬ বছর পর ২০০২ সালের ২৬ নভেম্বর বিকালে বর্তমান কোটশিলার বাঁশগড়ে জোতদার-জমিদার জগদীশ তেওয়ারিকে হাঁড়িকাঠে বলি দেয় প্রায় ২০০ জন বন্দুকধারী নকশাল। যা ছিল জঙ্গলমহলে নকশালদের প্রথম হিংসার ছবি। তার ১৩ বছর পর ২০১৫ সালের ২০ জুন দুপুরে ওই কোটশিলার টাটুয়াড়া গ্রামে একটি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘকে পিটিয়ে মেরে উলটো করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ থেকে ৬০ বছর আগে মেয়েদের ইভটিজিং-র ঘটনায় এই কোটশিলার বেগুনকোদর স্টেশনকে ‘ভূতুড়ে স্টেশন’ বানিয়ে দিয়েছিলেন ওই স্টেশনের তৎকালীন স্টেশন মাস্টার। যা ২০২২ সালে ভূত চতুর্দশীর প্রাক্কালে ওই ভূতুড়ে স্টেশনের রহস্য ফাঁস হয়। তবে ‘ভূত ভূত’ খেলা এখনও চলছেই জয়পুর বিধানসভার বেগুনকোদরে।এমন সব আলোড়ন ফেলা ঘটনা জয়পুর বিধানসভাতে নির্বাচন পর্বেও অটুট।
ঝালদা মহকুমাশাসক কার্যালয়ে মনোনয়ন দিতে গিয়ে ভোটের ময়দানে লড়াই করা বিপক্ষ দল ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারি মোর্চার সুপ্রিমো তথা ঝাড়খণ্ডের ডুমরির বিধায়ক টাইগার জয়রাম মাহাতোর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে ভাইরাল হয়েছিলেন এই আসনের তৃণমূল প্রার্থী অর্জুন মাহাতো।
সেই ঝাড়খণ্ড ছুঁয়ে থাকা জয়পুরেই শুধু দুই ফুলের লড়াই নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানে চতুর্মুখী। আর ফ্যাক্টর তো বহুমুখী! এই বিধানসভা জয়পুর, ঝালদা ২ ও আড়শা ব্লকের একাংশ নিয়ে। জয়পুর ব্লকে মোট ৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত, সবকটি তৃণমূলের দখলে। অন্যদিকে ঝালদা ২ নম্বর ব্লকের ৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত। যার মধ্যে একটি বাদ দিয়ে সবকটি শাসকদলের দখলে। বামনিয়া-বেলাডি শুধু কংগ্রেস সমর্থিত সিপিএমের প্রধান। অন্যদিকে আড়শা ব্লকের আড়শা ও বেলডি গ্রাম পঞ্চায়েত শাসক দলের। মানকিয়ারি কুড়মি সমাজের। এই আদিবাসী কুড়মি সমাজই এখানকার নানান সমীকরণ, ভোট ছবি সব যেন ওলটপালট করে দিয়েছে।
জয়পুর বিধানসভার ১৯টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ১৭টি। কংগ্রেস-সিপিএম এবং আদিবাসী কুড়মি সমাজের একটি। এই ছবি দেখে মনে হবে ঘাসফুলের একেবারে শক্ত ঘাঁটি। তাছাড়া এলাকা যে প্রাক্তন মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোর খাস তালুক। তাঁর প্রয়াত বাবা রামকৃষ্ণ মাহাতোর আবেগ। কিন্তু বাস্তব ছবিটা একেবারে ভিন্ন। এখানে কুড়মি জনজাতির ভোটার রয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। কুমার সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। তফসিলি উপজাতি ৮ শতাংশ। আর তফসিলি জাতি ১৪ শতাংশ ও সংখ্যালঘু ১০ শতাংশ। ফলে কুড়মি ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর। কারণ তাদের আন্দোলনের মূল দাবি, আদিবাসী তালিকাভুক্তি পূরণ হয়নি। আদিবাসী কুড়মি সমাজের অভিযোগ রাজ্য কমেন্ট ও জাস্টিফিকেশন পাঠায়নি। তাই ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকেই তাদের ‘নো ভোট টু টিএমসি’ ডাক। তাই বিজেপি শাসকের উপর ক্ষুব্ধ থাকা আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতোর ছেলে বিশ্বজিৎ মাহাতোকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থী করে ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছে বিজেপি। তাদের দ্বিতীয় প্রার্থী তালিকায় বিশ্বজিৎ মাহাতোর নাম বিজেপি সমর্থিত প্রার্থী থাকলেও সময় যত গড়িয়েছে এবং মনোনয়ন শেষে দেখা গিয়েছে পদ্ম প্রতীকেই লড়ছেন বিশ্বজিৎ, যা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের শেষ নেই বিজেপিতে।
গত লোকসভা ভোটে পুরুলিয়া কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছিলেন আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো। তিনি এই জয়পুর বিধানসভায় ভোট পান অন্যান্য বিধানসভার থেকে বেশি – ২৫ হাজার ৪৪১। সামগ্রিকভাবে তিনি ১ লাখের চেয়ে লোকসভায় কম ভোট পেলেও এই বিধানসভাতেই ২৫ হাজারের বেশি ভোট তাঁর পক্ষে পড়ে। যেহেতু এই বিধানসভায় কুড়মি জনজাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাই শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আদিবাসী কুড়মি সমাজ কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা-সহ নানা দাবি পূরণের স্বপ্ন দেখিয়ে মূল মানতার ছেলেকে প্রার্থী করে।
হিসাব কষলে দেখা যাবে গত লোকসভা ভোটের নিরিখে একদিকে কুড়মি সমাজের ২৫ হাজার ৪৪১ ভোট। সেই সঙ্গে বিজেপির ৭২ হাজার ২২২ ভোট। এই দুই ভোট মিলে গেলে এই বিধানসভাতে শাসককে দুরমুশ করবে পদ্ম। চব্বিশের লোকসভা ভোটে পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী শান্তিরাম মাহাতো জয়পুরে ভোট পেয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৭৮৩। ফলে বিজেপির থেকে ৬,৫৬১ ভোট লিড ছিল তৃণমূলের।
কিন্তু একুশের বিধানসভা ভোটের পরে এখানে বিজেপির বিধায়ক হন ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে আসা প্রাক্তন সাংসদ নরহরি মাহাতো। একুশের ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী উজ্জ্বল কুমারের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় তৃণমূল বিক্ষুব্ধ নির্দলের দিবজ্যোতি সিং দেওকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করে রাজ্য তৃণমূল। নির্দল প্রার্থী হয়ে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৪২৯। তৃতীয় স্থানে ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন কংগ্রেস প্রার্থী ফণীভূষণ কুমার। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৬২,১৮০। অন্যদিকে জয়ী বিজেপি প্রার্থী নরহরি মাহাতো ভোট পান ৭৪,৩৮০। ফলে কুড়মি ভোটকে নিয়ে পদ্ম শিবির যে একেবারে নিশ্চিন্ত তা কিন্তু নয়। বিশ্বজিতের কাঁটা এখানে একদা বিজেপির গ্রামীণ নেতা, অনিমেষ মাহাতো। বিজেপির প্রার্থী পছন্দ না হওয়া সেই সঙ্গে সমাজ আন্দোলন করে বিজেপির প্রতীকে লড়াই করা বিশ্বজিত তথা তার বাবা মূল মানতার বিরুদ্ধেই অনিমেষ মাহাতোর ভোটে দাঁড়ানো। তিনি সমর্থন পান কুড়মি সমাজের নেগাচারির সঙ্গে যুক্ত থাকা নেতৃত্বদের। ফলে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঝুলছে কুড়মি সমাজের সকল ভোট বিশ্বজিতের ঝুলিতে পড়বে কি না। অনিমেষ যেমন একদিকে বিজেপির ভোট কাটবেন। তেমনই ভোট কাটবেন কুড়মি সমাজেরও।
তাছাড়া পদ্মের ভোট বেশ খানিকটা কেটে নিতে পারে এই প্রথম বাংলায় নির্বাচন লড়াই করা ঝাড়খণ্ডী দল ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার প্রার্থী বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের জয়পুর রাজপরিবারের সদস্য সেই দিব্যজ্যোতি সিং দেও। কারণ এই জঙ্গলমহলে কুড়মি আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো হাই কোর্টের অসাংবিধানিক-অগণতান্ত্রিক রেল অবরোধ করতে গিয়ে রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে বিতর্ক হওয়ার পরই ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার সুপ্রিমো তথা ঝাড়খণ্ডের ডুমরির বিধায়ক টাইগার জয়রাম মাহাতোকেই কার্যত কুড়মি আন্দোলনের মুখ করতে চাইছে জঙ্গলমহল। ফলে ওই দলের প্রার্থী দিব্যজ্যোতি সিং দেও যে কুড়মি ভোট কেটে নেবেন, তা বলছে রাজনৈতিক মহল। ফলে বিশ্বজিতের কাছ থেকে দু’ভাবে কুড়মি ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জয়পুর জনপদ ঘুরে এমন আভাসই মিলছে।
অন্যদিকে শাসক প্রার্থী একেবারে তরুণ পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সদস্য তথা জয়পুর ব্লকের যুব সভাপতি অর্জুন মাহাতো ভোট কাটাকাটির অঙ্কে যে একেবারে নিশ্চিন্ত, তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। কারণ অর্জুনের কাঁটাও যে একাধিক। সেই কাঁটা বিছানো পথ ভোটের আগে পর্যন্ত কতটা মুক্ত করতে পারবে সেটাই চ্যালেঞ্জ পুরুলিয়া জেলা পরিষদে ১০০ শতাংশ টাকা খরচ করে সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুনজরে থাকা অর্জুন। দিব্যজ্যোতি তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ হওয়ায় টাইগারের দলের এই প্রার্থী শাসকদলেরও ভোট কাটবেন। এছাড়া এই অর্জুনকে ঘিরে দলীয় কলহ জয়পুর বিধানসভায় চরমে। যেমন জয়পুর ব্লকে, তেমনই ঝালদা ২ ও আড়শা ব্লকে। দলের অন্দরে এই দড়ি টানাটানিতে উঠে দাঁড়ানো রীতিমতো চ্যালেঞ্জের। তাইতো দলের প্রার্থীকে জেতাতে অভিষেক বলে গিয়েছিলেন, জয়পুর হবে ডায়মন্ড হারবার মডেল! অর্থাৎ যেভাবে তিনি তাঁর লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারকে আগলে রাখেন, একইভাবে জয়পুরকেও রাখবেন।
এদিকে অর্জুন কুড়মি জনজাতির হওয়ায় ওই জনজাতির কিছু ভোট যে নিশ্চিতভাবে পাবেন তা বলছে রাজনৈতিক মহল। তবে এই বিধানসভার খাসতালুক প্রাক্তন মন্ত্রী, দলের রাজ্য নেতা সেই শান্তিরাম মাহাতো ভোটের শেষ পর্বে এই জয়পুরে কীভাবে ‘খেলবেন’, তার উপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু। দল চাইছে, শান্তিরাম বলরামপুর কেন্দ্রের প্রার্থী হলেও তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে এই বিধানসভায় কাজে লাগাতে। কাজে লাগাতে চাইছেন তাঁর প্রয়াত বাবা রামকৃষ্ণ মাহাতোর আবেগকেও। কিন্তু দলীয় কাঁটা বিছানো পথে অর্জুনের লড়াই যে মহাভারতের যুদ্ধের মতই কঠিন। ভোটের (West Bengal Assembly Election) শেষ পর্বে এসে তিনি তা বুঝে গিয়েছেন। তৃণমূল প্রার্থী অর্জুন মাহাতো বলছেন, “ভোট অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উন্নয়ন দিয়ে হয়। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে উন্নয়নের কাজ করেছেন তাকে সামনে রেখে আমি জিতব।”
তবে পদ্ম প্রতীকে প্রার্থী হওয়া আদিবাসী কুড়মি সমাজের বিশ্বজিৎ মাহাতো বলেন, “এই আসন আমরা জিতে গিয়েছি। সমগ্র জেলার মধ্যে এই আসনেই সবচেয়ে বেশি আমাদের মার্জিন থাকবে। প্রচারে মানুষজনের ব্যাপক সাড়া মিলছে।” বিশ্বজিৎ সাড়া মিলছে দাবি করলেও সমাজ আন্দোলন থেকে একেবারে সরাসরি রাজনীতিতে চলে আসাকে আদিবাসী কুড়মি সমাজের এমনকি এই জনজাতির একটা অংশ মেনে নিতে পারছে না। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর বাবা মূল মানতার কিছু কার্যকলাপ। যেমন তিনি অতীতে হিন্দু দেবদেবীর সম্বন্ধে কুকথা বলেছিলেন। যে কারণে বিজেপির একাংশ তাকে মানতে পারছে না। মানতে পারছে না ওই বিধানসভার সাধারণ মানুষজন। এই কারণে সম্প্রতি তাঁকে ওই বিধানসভায় ঘেরাও হতে হয়েছিল। সেই সঙ্গে বান্ডিল-বান্ডিল টাকার সামনে ভাইরাল হয় তাঁর ভিডিও(সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল তার সত্যতা যাচাই করেনি)।
এই কাঁটাছেঁড়া অঙ্কের শেষ এখানেই নয়। জয়পুরে আসল ক্লাইম্যাক্স কংগ্রেসের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রার্থী ফণীভূষণ কুমার। এখানে প্রায় ১৬ শতাংশ কুমার সম্প্রদায়ের মানুষজন রয়েছেন। তাই এই সম্প্রদায়ের মানুষজন চেয়েছিলেন শাসক বা বিজেপি থেকে কেউ কুমার প্রার্থী হোক। কিন্তু তা হয়নি। ফলে ওই সম্প্রদায় ব্যাপক ক্ষুব্ধ রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের খবর। ফলে সেই ভোটের অধিকাংশ যে ফণীভূষণ কুমারের দিকেই পড়ে যাবে এমনই বলছে রাজনৈতিক মহল। সেই সঙ্গে একুশের বিধানসভা ভোটের নিরিখে কংগ্রেসের আলাদা ভোট রয়েছে ৬২ হাজার ১৮০। গত বিধানসভাতেও তিনি প্রার্থী ছিলেন। তাঁর কথায়, “আমি এবার জিতবই। আমাকে সকলেই ভোট দেবেন। শাসক দল উন্নয়ন নিয়ে যে প্রচার করছে তার কোনও ভিত্তি নেই। উন্নয়ন হয়েছে শুধু নেতাদের। আর বিজেপি মোট ছটি শব্দের উপরে টিকে আছে। হিন্দু-মুসলমান, মন্দির-মসজিদ আর ভারত-পাকিস্তান। এর বাইরে তাদের উন্নয়নের কোনও কথা নেই।” অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চা তৃণমূল বিক্ষুব্ধ দিব্যজ্যোতি সিং দেও বলছেন, “সমীকরণ বলছে এই আসনে এবার আমার জিত। বিধানসভার সকল স্তরের মানুষ আমাকে ভোট দেবেন।” বিশ্বজিতের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানো অনিমেষ মাহাতো আবার বলেন, “শুধু কুড়মি জনজাতির ভোট নয়। আমাদের যারা হিতমিতান আছে অর্থাৎ আমাদের নানান কাজে যে সকল সম্প্রদায় সাহায্য করে থাকেন। তারা সকলেই আমাকে ভোট দেবেন।”
অনিমেষ বিজেপি, কুড়মি ভোট কাটার পাশাপাশি এনডিএ-র ছোট শরিক আজসু (অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন)ভোট পাবে। কারণ বাঘমুণ্ডি আসন আজসুকে ছাড়েনি বিজেপি। ফলে বড় শরিক বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। সেই সঙ্গে জয়পুরে বিজেপির প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় অনিমেষের স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া মাহাতো সম্প্রতি আজসুতে যোগদান করেন। যিনি অতীতে পুরুলিয়া জেলা পরিষদে বিজেপির সদস্য ছিলেন। বিজেপির পুরুলিয়া জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন দু’বার। সম্প্রতি তিনি বিজেপি ছেড়ে আজসুতে যোগ দেওয়ার আগে বিজেপির মহিলা মোর্চার রাজ্যের সদস্য ছিলেন। ছিলেন বাঁকুড়া ইনচার্জের দায়িত্বে। ফলে তিনি যে আজসু ভোট ভাঙিয়ে আনবেন তা একেবারে পরিষ্কার। এই আসনে বামফ্রন্ট মনোনীত ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী, প্রাক্তন বিধায়ক ধীরেন্দ্রনাথ
মাহাতো প্রার্থী হওয়ায় সিপিএমের পছন্দ নয়। ফলে সিপিএমের ভোট কোন দিকে যাবে, সেটাও একটা বড় ফ্যাক্টর। তবে রামে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ সেখানে মূল মানতার ছেলে প্রার্থী। এদিকে নীতির বিরুদ্ধে শাসকদলে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে তৃণমূল বিক্ষুব্ধ টাইগারের দলে ওই ভোট পড়লে বদলে যেতে পারে অনেক অঙ্কই।
এই বিধানসভায় এখন ভোট (West Bengal Assembly Election) কাটাকাটির অঙ্কই প্রধান। সমগ্র জেলার সঙ্গে এই বিধানসভা আসনে এসআইআরের কোন প্রভাব নেই। ওই চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বাদ পড়ে ১৯,৭২৬ জন। বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ছিল ২,৮৬৯। যার মধ্যে নাম যুক্ত হয়েছে ২,১৩৩। বাদ গিয়েছে ৭৩৩। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এই বিধানসভায় ভোটার ছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬৬। সেই সঙ্গে ২,৮৬৯ যোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ২৩৫ জন। আগে ভোটার ছিল ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৬১। অর্থাৎ সবমিলিয়ে বাদ পড়া সংখ্যার অধিকাংশটাই মৃত। যা খুব স্বাভাবিকভাবে বাদ যেত। এদিকে উন্নয়ন-অনুন্নয়নের প্রশ্নে ভোটে পানীয় জল বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জয়পুর ব্লকের একাধিক গ্রামের পানীয় জলের সমস্যা দীর্ঘদিনের। প্রায় একই ছবি ঝালদা ২ ব্লকের। সেই সঙ্গে ঝালদা ২ ব্লকে থাকা বিড়ি শ্রমিকদের অধিকাংশদের জীবন উপেক্ষিত। তারা বিড়ি বেঁধে সঠিক দাম পান না। কেন্দ্রের উদাসীনতায় তাদের হাসপাতাল নিয়ে নানান সমস্যা রয়েছে।যদিও তৃণমূল জানিয়েছে, ভোটের পর এই সমস্যার সমাধান করবে।
এছাড়া আরও সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজ না পাওয়া। কাজের জন্য ভিন রাজ্যে গিয়ে পরিযায়ীদের প্রাণ যাওয়া। সাম্প্রতিককালে এই বিধানসভায় এমন ঘটনা ঘটেছে একাধিক। এই এলাকার বহু পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যের পরিযায়ী জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আওতায় আসেনি। এই বিষয়গুলো যে ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলবে তা বলাই যায়। তবে অন্যদিকে উন্নয়নের তালিকা বেশ দীর্ঘ। মসৃণ রাস্তাঘাট, সৌরচালিত পানীয় জল প্রকল্প, মাথার উপর পাকা ছাদ। এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে ভাতা তো রয়েইছে!