দুই নারী হাতে তরবারি, কেমন হল স্বস্তিকা-পাওলির ‘বিবি পায়রা’? পড়ুন রিভিউ
প্রতিদিন | ১৪ এপ্রিল ২০২৬
পরিচালক অর্জুন দত্তর নতুন ছবি ‘বিবি পায়রা’ যে রানওয়েতে টেকঅফ করছে, তা খুব একটা মসৃণ নয়। বাংলা ছবির ব্যবসা নিয়ে হতাশা বাড়ছে, টলিউডে শোক এবং অন্দরমহলের তরজা, সেই সঙ্গে প্রাক নির্বাচন পরিস্থিতি– যখন দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টেনে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ। তেমন পরিস্থিতিতেও লিখছি ‘বিবি পায়রা’ হল-এ গিয়ে দেখার ছবি। সিরিয়াস বিষয় নিয়েও যে হালকা মেজাজের ছবি বানানো যায় অর্জুন দেখালেন।
নারীকেন্দ্রিক ছবি মানে শুধুই বঞ্চনার গল্প বা কান্নাকাটি নয়। প্রথমার্ধে প্রাণভরে হাসার স্পেস দিয়েছেন পরিচালক অর্জুন। তিনি এবং আশীর্বাদ মৈত্র যে চিত্রনাট্য লিখেছেন তা বাস্তবছোঁয়া, একই সঙ্গে এন্টারটেনিং। আর চমৎকার ছবির অভিনেতা নির্বাচন। মূল চরিত্রে পাওলি দাম (ঝুমা) এবং স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় (শিউলি)। এককথায় যেন ‘দুই নারী হাতে তরবারি’। তারা নিতান্তই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ। শিউলি বেশ সোজাসাপটা, বেশি কথা বলে, নরম স্বভাবের। অন্যদিকে ঝুমা খানিক ডাকাবুকো, অবস্থার চাপে নতিস্বীকার করতে নারাজ। দুজনেই অসুখী দাম্পত্যের মাঝে পড়ে গিয়েছে। এমন সময় তাদের দেখা হচ্ছে যখন বন্ধ দরজার আড়ালে প্রতিনিয়ত হয় শারীরিক, নয় মানসিক অত্যাচার সহ্য করে চলেছে দু’জনেই। তাদের পড়াশোনা সামান্য, অর্থিকভাবেও পরনির্ভরশীল, ফলে পরিস্থিতির বিপরীতে যাওয়ার উপায়ও নেই। তার পরেও ঝুমা আর শিউলি নিজেদের মতো করে উড়তে চায়। সংসার যখন দমবন্ধ করে ফেলেছে, তারা বেরনোর পথ খোঁজে। প্রয়োজনে স্বামীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতেও আর দ্বিধা করে না। যদিও সেই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এখানে নারী যেমন পুরুষতন্ত্রের শিকার, একইরকম ভাবে প্রতিটি পুরুষচরিত্রও প্যাট্রিয়ার্কির ভিকটিম। ছবিটা ডার্ক কমেডি এবং বহুস্তরীয়। অর্জুন দত্ত তাঁর আগের ছবিতে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, ফলে তাঁর নতুন ছবি নিয়ে আগ্রহ ছিল। প্রত্যাশা পূরণ করেছেন তিনি, কমফর্ট জোনের বাইরে গিয়ে চালিয়ে খেলেছেন। তাঁর আগের করা ছবিগুলোর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ‘বিবি পায়রা’।
সিচুয়েশনাল কমেডির মজা ভরপুর। আর দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন অভিনেতারা। পার্শ্বচরিত্রে এখানে পুরুষরা। অনির্বাণ চক্রবর্তী, স্বস্তিকার নারীবিদ্বেষী স্বামী জগন্নাথের ভূমিকায় আগাগোড়া বিশ্বাসযোগ্য। ঈষৎ ধূসর চরিত্রেও তিনি দুরন্ত। অনিন্দ্য সেনগুপ্ত ইনসিওরেন্স এজেন্ট দেবুর চরিত্রে ফাটিয়ে দিয়েছেন। ভালো লাগে অঙ্কিতা মাঝিকে, কূচক্রী ননদের চরিত্রে তিনি। ঝুমার পিসির চরিত্রে ভবানী বসু মজুমদার বেশ ভালো। সুব্রত দত্ত ঝুমার স্বামীর চরিত্রে অবাক করেছেন, তিনি জাত অভিনেতা বলার অপেক্ষা রাখে না। অফিসের টক্সিক বসের ভূমিকায় লোকনাথ দে অত্যন্ত সাবলীল। পার্শ্বচরিত্ররা এত দক্ষ অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন যে প্রধান চরিত্রদের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। পাওলি এক কথায় ব্রিলিয়ান্ট। সংযত অথচ কার্যকরী তাঁর অভিনয়। যন্ত্রণার সিকোয়েন্সেও অনবদ্য। স্বস্তিকা চরিত্রের চাহিদা অনুযায়ী কিছুটা চড়া হলেও শিউলি হয়ে ফুটেছেন আক্ষরিক অর্থে। দুই নারীই আবেগের ওঠানামা এবং রংবদলের খেলায় পায়রার মতো আকাশে উড়ান দিয়েছেন। তাঁদের তথাকথিত ফাইট সিকোয়েন্সেও বেশ লাগে দেখতে। অনির্বাণ চক্রবর্তী নারীবিদ্বেষী স্বামী, কিন্তু দিদির প্রতি আস্থাশীল। চরিত্রের দোলাচল দারুণ তুলে এনেছেন। ছবির প্রথমার্ধ প্রায় খুঁতহীন। দ্বিতীয়ার্ধে যেন একটু তাড়াহুড়ো করে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছনো হয়েছে। সাবপ্লট এসে, ফোকাস নড়িয়ে দিয়েছে। গার্হস্থ্য হিংসার যে ছবি অর্জুন দেখিয়েছেন ভীষণ সত্যি, তবে পিসির ক্ষেত্রে হিংসা সহ্য করার একই রূপ না দেখালেও হত। খুব বেশি যুক্তির কথা না ভেবে ছবিটা দেখতে হয়। সুপ্রতিম ভোলের সিনেমাটোগ্রাফি এবং এডিটিং বেশ ভালো। সব মিলিয়ে ‘বিবি পায়রা’ উপভোগ্য ছবি।