প্রদীপ চক্রবর্তী, চুঁচুড়া
গঙ্গার পশ্চিম তীর বরাবর হুগলি জেলায় ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য হেরিটেজ ভবন। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে সেই সব ঐতিহাসিক বাড়ি একটু একটু করে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হেরিটেজ ধ্বংস করে মাথা তুলছে বহুতল। বাড়তি মুনাফার লোভে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন প্রোমোটাররা। তা নিয়ে মাঝে মধ্যেই অভিযোগ দায়ের হলেও হেরিটেজ রক্ষার ব্যাপারে তেমন কোনও উদ্যোগ নেই। ভোটমুখী বঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলি নানা ইস্যু নিয়ে সরব হলেও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি কারও ভাবনার মধ্যেই নেই। এ নিয়ে হতাশ আম নাগরিকরা।
হুগলির সপ্তগ্রাম, চুঁচুড়া, চন্দননগর ও শ্রীরামপুরের মতো শহরে ছড়িয়ে রয়েছে অনেক পুরোনো বাড়ি। সেই তালিকায় রয়েছে শ্রীরামপুরের ২০৮ বছরের হান্না হাউস, চন্দননগরের সরষে পাড়ার বিপ্লবী কানাইলাল ঘোষের বাড়ি, শ্রীরামপুরের ক্ষেত্রমোহন শাহ মেলা বাড়ি এবং চন্দননগরের দয়ালমঞ্জিল ভবন। অভিযোগ, বড় বড় মনীষীদের স্মৃতি বিজড়িত পুরোনো বাড়িগুলি হেরিটেজ তকমা পেলেও সরকারি তরফে সংরক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই। বাড়িগুলিকে মেরামত করার জন্য কোনও সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেই। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় মালিকরা নিজেদের উদ্যোগে বাড়িগুলিকে মেরামত করতে পারছেন না। উল্টে হেরিটেজ আইনের জাঁতাকলে পড়ে পুরোনো বাড়ি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।
হুগলিতে এরকম অনেক বাড়ি পুরোনো বাড়ি রয়েছে, যেগুলি হেরিটেজ কমিশনের তকমা পাওয়ার পরেও তাদের হাল ফেরেনি। জরাজীর্ণ বাড়িগুলি কোনও রকমে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। যেমন, শ্রীরামপুর মিশন স্কুল লাগোয়া হান্না হাউস। কয়েক বছর আগে বাড়ির একাংশ ধসে পড়ার পরে তার চারপাশ টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। সেই শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক বাড়ি এখন মুখ ঢেকেছে ঘন জঙ্গলে। ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন, ১৮১৮ সালে হান্না হাউস নির্মিত হয়, যার সঙ্গে হান্না মার্শম্যানের নিবিড় যোগ ছিল। আইনজীবী জয়দীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, 'হান্না হাউস এশিয়ার নারী শিক্ষার অন্যতম প্রতীক। এই ভবনের দরজা, জানালা চুরি হয়ে গিয়েছে। অসাধু প্রোমোটার চক্র বাড়ি দখল করতে চেয়েছিল। সাধারণ নাগরিকরা সেটা রুখে দিয়েছে। আমরা অনেক চেষ্টা করেও বাড়িটিকে হেরিটেজের তালিকায় আনতে পারিনি।'
শ্রীরামপুর পুরসভার চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিল সন্তোষ কুমার সিংহ বলেন, 'পুরোনো বাড়ির শরিকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে বাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই পুরোনো বাড়ির হাতবদল ঠেকানো যাচ্ছে না।'
শ্রীরামপুর পুরসভার পুরপ্রধান শিক্ষার অন্যতম প্রতীক। এই ভবনের দরজা, জানালা চুরি হয়ে গিয়েছে। অসাধু প্রোমোটার চক্র বাড়ি দখল করতে চেয়েছিল। সাধারণ নাগরিকরা সেটা রুখে দিয়েছে। আমরা অনেক চেষ্টা করেও বাড়িটিকে হেরিটেজের তালিকায় আনতে পারিনি।'
শ্রীরামপুর পুরসভার চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিল সন্তোষ কুমার সিংহ বলেন, 'পুরোনো বাড়ির শরিকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে বাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই পুরোনো বাড়ির হাতবদল ঠেকানো যাচ্ছে না।'
শ্রীরামপুর পুরসভার পুরপ্রধান গিরিধারী শাহ বলেন, 'আমরা ডেনিস ট্র্যাভার্ন, ডেনিস গভর্নর হাউস, শ্রীরামপুর আদালতের উত্তর-দক্ষিণ প্রবেশদ্বার সংস্কার করেছি। বেশ কিছু প্রকল্প আছে, যেগুলি ভোটের পরে আমরা বাস্তবায়ন করব।'
চন্দননগরের বড়বাজার, ধড় গলি, পালপাড়া, ফটকগোড়ার মতো জায়গায় অনেক বিপ্লবী ও মনীষীদের বাড়িঘর ছিল। তার মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ির কোনও অস্তিত্বই নেই। সেখানে প্রোমোটিং হয়েছে। চন্দননগরের বৈদ্যপোতায় দাসদের বিশাল আয়তনের বাড়ির বয়স একশো বছরের বেশি। সেটিরও বেহাল অবস্থা। রাসবিহারী বসুর গবেষক তথা চন্দননগর হেরিটেজের সম্পাদক কল্যাণ চক্রবর্তী বলেন, 'ঢাকঢোল পিটিয়ে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন কোনও স্থাপত্যকে হেরিটেজ ঘোষণা করার পরে আইনের ফাঁসে আসল কাজটাই হয় না। চন্দননগরের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শহরে একের পর এক পুরোনো বাড়ি হারিয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে বিপ্লবী চারুচন্দ্র রায়ের বাড়ি, সরষে পাড়ায় বিপ্লবী কানাইলাল ঘোষের বাড়ি।'
সমাজকর্মী বিজয় গুহ মল্লিক বলেন, 'চন্দননগরের পুরোনো বাড়িগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। নতুন সরকার এ ব্যাপারে এগিয়ে আসুক।' সমাজকর্মী বিজয় গুহ মল্লিক বলেন, 'চন্দননগরের পুরোনো বাড়িগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। নতুন সরকার এ ব্যাপারে এগিয়ে আসুক।'
চন্দননগরের মেয়র রাম চক্রবর্তী বলেন, 'ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা বাড়িগুলি হাতবদলের ক্ষেত্রে পুরনিগমের কিছু করার থাকে না। কিছু বাড়িতে শরিকি সমস্যা থাকার কারণে মেরামতে সমস্যা হয়। তবে কিছু স্থাপত্য আমরা পুনরুদ্ধার করেছি।'
চন্দননগরের তৃণমূল প্রার্থী ইন্দ্রনীল সেন বলেন, 'পুরোনো বাড়িগুলি তৎকালীন সামাজিক ব্যবস্থাকে প্রতিফলিত করে। সেখানে নতুন নির্মাণ মানে ইতিহাস কে মুছে ফেলা। আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসার পরে হেরিটেজ কমিশনের আওতায় থাকা বাড়িগুলিকে সংস্কার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে।'